প্রচ্ছদ

অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফর বাতিলের নেপথ্যে ২ তরুণী

প্রকাশিত হয়েছে : ১১:৩৩:৩৯,অপরাহ্ন ০৫ অক্টোবর ২০১৫ | সংবাদটি ৪৬২ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

1_110122ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফর বাতিলের পেছনে ‘অনুঘটক’ হিসেবে লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই তরুণীকে শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। রুমানা হাশেম ও অজন্তা দেব রায় নামে ওই দুই তরুণী লন্ডনে বসে টুইটারে বাংলাদেশের ২১ জন মুক্তমনা ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখকের হিটলিস্ট প্রকাশ করেন। এর সূত্র ধরে বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার বিষয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করে। ওই সংবাদগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয় অস্ট্রেলিয়া।

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম সফর বাতিল করায় ভাবমূর্তির দিক মাথায় রেখে বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ওই দুই তরুণীর বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। এ সংক্রান্ত একটি গোপন প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে।

গোয়েন্দারা রুমানা হাশেম ও অজন্তা দেব রায়ের গ্রামের বাড়িসহ তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে। এ ছাড়া গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের দল শিগগির লন্ডনে যাবে। সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় দুই তরুণীর কাছে ২১ জনের হিটলিস্টের সূত্র সম্পর্কে জানতে চাইবেন গোয়েন্দারা। রুমানার টুইট পেজে নিজেকে বর্ণবাদবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট-সমাজবিজ্ঞানী উল্লেখ করেছেন। তবে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ওই দুই তরুণী ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুক্তমনের লেখালেখি করেন। কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে রুমানা টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে ছবি সম্বলিত একটি টুইট করেন। টুইটে ছবির ক্যাপশনে বলা হয়, রুমানা হাশেম তার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি হিটলিস্ট পেয়েছেন। আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের হিটলিস্টে নাম ও বর্তমান অবস্থানের ঠিকানায় রয়েছেন প্রখ্যাত লেখক ও কলামনিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী (লন্ডন), দাউদ হায়দার (জার্মানি), তসলিমা নাসরিন (ভারত), নিহত ব্লগার অভিজিতের স্ত্রী বন্যা আহমেদ (আমেরিকা), আসিফ মহিউদ্দিন (জার্মানি), অনন্য আজাদ (জার্মানি), ওমর ফারুক লুকস (জার্মানি), ফারজানা কবির খান (জার্মানি), ছদ্মনামধারী ‘নাস্তিকের ধর্মকথা’ (জার্মানি), সুব্রত শুভ (জার্মানি), ফড়িং ক্যামেলিয়া (জার্মানি), কামরুল হাসান (লন্ডন), সুশান্ত দাশগুপ্ত (লন্ডন), আরিফুর রহমান (লন্ডন), অজন্তা দেব রায় (লন্ডন), মনির হোসেন (বার্মিংহাম), শান্তনু আদিব (লন্ডন), নিঝুম মজুমদার (লন্ডন), রুমানা হাশেম (লন্ডন), রায়হান আবির (কানাডা) ও নির্ঝর মজুমদার (সুইডেন)।

সূত্র জানায়, রুমানার ওই টুইটের কিছুক্ষণ পর অজন্তা দেব রায় পোস্টের নিচে মন্তব্য করেন- ‘আমি বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি।’ গোয়েন্দাদের ধারণা, অজন্তা লন্ডন পুলিশকে এ ধরনের তথ্য জানান। আর রুমানাকে ২১ জনের হিটলিস্টের তালিকাও অজন্তা সরবরাহ করেন। এ জন্য রুমানার পাশাপাশি গোয়েন্দারা অজন্তাকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন।

রুমানার টুইটার পেজে দেখা যায়, ওই বার্তা টুইট করার দুদিন পর, অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘ এনজিও কমিটি অন ফ্রিডম অব রিলিজন অর বিলিফ- এর প্রেসিডেন্ট মিকায়েল ডি ডোরা একই টুইটে মন্তব্য করেন। তবে মিকায়েল তার মন্তব্যে রুমানার কাছে হিটলিস্টের তথ্যসূত্র জানতে চান। জবাবে পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর রুমানা একই পোস্টের নিচে সূত্র হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ও পুলিশের কথা উল্লেখ করেন। তবে বাংলাদেশ সরকার ও পুলিশ এ ধরনের কোনো হিটলিস্টের কথা স্বীকার করেনি।

এদিকে রুমানার টুইটে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। টুইট ঝড়ের ২০ দিন পর বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন আনসারউল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) কর্তৃক ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখকদের হিটলিস্ট প্রকাশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে লন্ডনের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশি একটি ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন অসাম্প্রদায়িক ব্লগার, লেখক ও সারা বিশ্বে বসবাসকারী অ্যাক্টিভিস্টদের তালিকা তৈরি করেছে, যাদের হত্যা করা হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ইসলামী জঙ্গিদের এই তালিকা সহিংসতা আকারে রূপ নিলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়ানোসহ আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তারলাভ করতে পারে।’ এতে বলা হয়, হিটলিস্টে থাকা লন্ডনভিত্তিক টার্গেটকৃত ব্লগারদের মধ্যে ৭ জন জার্মানি, ২ জন যুক্তরাষ্ট্র, ১ জন কানাডা এবং ১ জন সুইডেন আছেন।

গার্ডিয়ানের একদিন পর অন্য একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেক প্রভাবশালী গণমাধ্যম সিএনএন। সিএনএন টেলিভিশন ও অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এক্সট্রিমিস্ট ইন বাংলাদেশ পাবলিশ গ্লোবাল হিটলিস্ট অব ব্লগারস অ্যান্ড রাইটার্স’। প্রতিবেদনে হিটলিস্টে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ না করলেও এতে বলা হয়, যারা হুমকির মধ্যে রয়েছেন তারা যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এতে হামলা করতে প্রস্তুত জঙ্গি সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশের আনসারউল্লাহ বাংলা টিমকে দায়ী করা হয়।

গার্ডিয়ান ও সিএনএনে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার একদিনের মাথায় রুমানা হাশেমের প্রকাশ করা হিটলিস্টে থাকা ২১ জনের হুবহু নাম ও তাদের অবস্থানের ঠিকানা সংবলিত অন্য একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতের ইন্ডিয়া টিভি। ইন্ডিয়া টিভির অনলাইনে বলা হয়, বাংলাদেশের জিহাদি গ্রুপ আনসারউল্লাহ বাংলা টিম ব্লগারদের গ্লোবাল হিটলিস্ট প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন খ্যাতিমান লেখিকা তসলিমা নাসরিনের নামও। যিনি ফতোয়াবিরোধী বক্তব্যর কারণে হত্যার আশঙ্কায় গত ২১ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, রুমানা হাশেম, অজন্তা দেব রায় এবং বৈশ্বিক মিডিয়ায় ২১ জনের হিটলিস্ট প্রকাশ করা হলেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম একে মিথ্যা বলে আসছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নিজস্ব ওয়েবপেজের দাবিদার ‘জিহাদোলজি’তে ২১ জনের হিটলিস্টকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করে বলা হয়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে প্রকাশিত তথাকথিত ‘বৈশ্বিক হিটলিস্ট’ এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব কারণে গোয়েন্দারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন, রুমানা ও অজন্তার টুইট এবং লন্ডনী গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মিথ্যা হিটলিস্ট নিয়ে কথা বলার পর তা বিশ্বমিডিয়ায় চলে আসে।

সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com