‘দোকান বন্ধ, বেতনও বন্ধ’: সঙ্কটে সিলেটের দোকান কর্মচারীরা

প্রকাশিত: ১২:১০ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

‘দোকান বন্ধ, বেতনও বন্ধ’: সঙ্কটে সিলেটের দোকান কর্মচারীরা

‘দোকান খোলা নাই। এর লাগি বেতনও নাই। ২৩ মার্চ থাকি দোকান বন্ধ। খুব কষ্টে দিনযাপন করা লাগের। কয়েকদিন আগে বহু কষ্টে মালিকের কাছ থাকি খুঁজিয়া ৫ হাজার টেখা (টাকা) আনছি। কোনোভাবে পরিবার নিয়া চলতাছি।’- কথাগুলো বলছিলেন সিলেটের আল হামরা শপিং সিটির একটি শাড়ির দোকানের এক কর্মচারী।

করোনাভাইরাসে প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশের ন্যায় সিলেটেও বন্ধ হয়ে যায় সকল দোকানপাট ও শপিংমল। ১০ মে থেকে সরদার সীমিত আকারে দোকানপাট ও শপিং মল খোলার অনুমতি দিলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় সিলেটের ব্যবসায়ীরা এগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে হাতেগোনা দুএকটি শপিং মল ছাড়া বন্ধ রয়েছে সিলেটের সব মার্কেট। বেশিরভাগ দোকানপাটও বন্ধ।

এতে বিপাকে পড়েছেন ওইসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বিক্রয়কর্মীসহ কর্মচারীরা। দোকানপাট বন্ধ থাকায় বেতনও পাচ্ছেন না তারা।

ঈদে পোষাকের দোকানসহ বিভিন্ন দোকান কর্মচারীরা বোনাস পেয়ে থাকেন। কিন্তু এবার ঈদের আগে বেতন পাওয়া নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন তারা। সিলেটের বেশ ক’জন দোকান কর্মচারির সাথে আলাপকালে এমন শঙ্কার কথাই জানা গেছে।

সিলেটের শুকরিয়া মার্কেটের একটি পোষাকের দোকানের কর্মচারি জানান, এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো ত্রাণও পাননি তিনি। ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে কিছু খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছিলো। এ ছাড়া আর কোনো সহায়তা পাননি।

গত ৮ মে নগর ভবনে বৈঠক করে সিলেটের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ জরুরী সেবা ব্যতিরেকে নগরীর সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেন। এতে দোকান কর্মচারীদের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। একদিকে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো, অন্যদিকে অর্থনৈতিক টানাপোড়ন। এতে সকলেই উভয় সংকটে পড়েছেন বলে জানান ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।

নগরীর সিটি সেন্টারের বৈশাখী শাড়ি ঘরের কর্মচারি জুয়েল বলেন, আমার দোকানের মালিক এপ্রিল পর্যন্ত বেতন দিয়েছেন। তিনি মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে আমার খোঁজখবরও নেন। এখন চলতি মে মাসের বেতন পাবো কি না জানি না। কারণ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে মালিকপক্ষেরও অনেক লোকসান হচ্ছে।

আল হামরা শপিং সিটির মনে রেখ শাড়ি ঘরের কর্মচারী সাইদুল ইসলাম বলেন, এখন শুধু আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেছি করোনা যেন তাড়াতাড়ি চলে যায়। না হলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের পক্ষ থেকে কর্মচারীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু কর্মচারীদের তুলনায় এই খাদ্যসামগ্রী অপ্রতুল। তাই যে স্টাফরা বেশি সমস্যায় আছেন তাদেরকে আগে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে।

মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদ সূত্রে জানা যায়, সিলেট নগরীতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রায় ১২ হাজার কর্মী।

এদিকে দীর্ঘ লকডাউনে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছেন সিলেটের ছোট, বড়সহ সব শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা। সাধারণত সব ব্যবসায়ীরাই ঈদের অপেক্ষায় থাকেন। কারণ সারাবছর কোনোরকমে বিকিকিনি হলেও ঈদ উৎসবেই বেশি ব্যবসা হয়। কিন্তু এবছর করোনার কারণে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। তাই লকডাউন ঘোষণার পর কেউ কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেন। কয়েকজন এপ্রিল মাসের বেতনও দিয়েছেন তাদের কর্মচারীদের। কিন্তু চলতি মে মাসে কর্মচারীদের বেতন ও বোনাস প্রদান নিয়ে সংশয়ে আছেন অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মালিক।

অপরদিকে ৮ মে নগরভববনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কর্মচারীদের বেতন প্রদানের ব্যাপারে দোকান মালিকরা উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্থ করেছেন। তারপরও যদি কোনো দোকান মালিক তার কর্মচারীদের বেতন প্রদান না করেন তাহলে মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের নেতৃবৃন্দের কাছে অভিযোগ করলে তারা এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে জানান ওই পরিষদের সভাপতি।

আল হামরা শপিং সিটির বধুয়া শাড়ী ঘরের পরিচালক মিসবাহ উদ্দিন বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে ১০ জন কর্মচারী আছেন। প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় সবাইকে মে মাস পর্যন্ত দিয়েছি। তবে এই মাসে ঈদের কারণে সবাইকে বোনাস দেওয়ার কথা। এখন  দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমি নিজেই লোকসানের মুখে আছি। তাই এবার তাদের বোনাস দেওয়া সম্ভব হবে না।

মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, আমরা সকল ব্যবসায়ীদের বলেছি তারা যেন তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের সকল বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন। দোকান মালিকরাও এ ব্যাপারে আমাদের আশ্বস্থ করেছেন। তারপরও কোনো স্টাফ যদি বেতন না পান সেটা আমাদের জানালে আমরা এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবো। এছাড়াও দরিদ্র স্টাফ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমরা খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করেছি।

তিনি বলেন, আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতেই সরকার বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে সীমিত আকারে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খেলার অনুমতি দেন। কিন্তু আমরা যখন সকল ব্যবসায়ীরা বৈঠকে বসলাম তখন আলোচনা করে দেখলাম ব্যান্ডের শপ ও কিছু শপিংমলে সীমিত আকারে ব্যবসায় চালু করলেও সকল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব না। তাই আমরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ আমরা মনে করি আগে জীবন পরে জীবিকা। এখন একদিকে করোনা, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক টানাপোড়ন। সব মিলিয়ে উভয় সংকটে আছি আমরা।

এ ব্যাপারে সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। তারপরও কর্মচারীদের বেতন যেন সবই পরিশোধ করেন সেটা আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি। আমরা সকল মার্কেটের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারির সাথে বৈঠক করেছি। সেখানে আমরা কর্মচারীদের বেতন প্রদান ও তাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বলছি। স্টাফদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করা হয়েছে। এখন সকল ব্যবসায়ী সচ্ছল না। তাদেরকে তো আমরা জোরও করতে পারবো না। এই করোনা মহামারিতে সবাইকেই সব ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমাকে ব্যবসায়ীরা কথা দিয়েছেন তারা নিজেদের দোকানের কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করবেন। আশাকরি তারা কথা রাখবেন।

আর্কাইভ

জুন ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« মে    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com