ভাষা থেকে ভূখন্ড

প্রকাশিত: ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০

ভাষা থেকে ভূখন্ড

আবু বকর পারভেজ

গাছের সঙ্গে শিকরের যেমন সম্পর্ক ভাষার সঙ্গেও আমার ঠিক সেইরকম সম্পর্ক। শিকর ছাড়া যেমন গাছের বৃদ্ধি ঘটেনা অথবা ডালপালার বিস্তৃতি হয়না মাতৃভাষা ছাড়াও আমার বিস্তৃতি অসম্ভব। আমি আমার চারপাশের সাথে পরিচিত হই আমার মায়ের ভাষার মাধ্যমে। আমি ভাষার মাধ্যমে চিনতে শিখি আমার সমাজ, আমার রাষ্ট্র,আমার বাড়ির পাশ দিয়ে ছুঁটে চলা বহমান নদী। জন্মের পর থেকে মায়ের কুলেতে এবং বুলিতে প্রথম যে ভাষা আমার কর্নে আঘাত করে। আমার মুখ থেকে প্রথম উচ্চারিত বুলি মা অথবা বাবা বাংলাতেই মধুর ছিলো অধিক শ্রবণীয় ছিলো। একটি জাতির আত্নপরিচয় ফুটে উঠে তার ভাষার মাধ্যমে। ভাষার মাধ্যমে তৈরী হয় তার সামাজিক সম্পর্ক। ভাষাভাষীর টানে মাঝে মাঝে ভিনদেশেও রক্তের বন্ধন না থাকলেও কেউ কেউ হয়ে পরম আত্নীয়। ভাষা তৈরী করে দেয় কাঁটাতার ভেদ করেও ভাষার বন্ধন অপার বাংলা এপার বাংলার সম্পর্ক বাস্তব উদাহারণ। একজন সাধারণ ব্যক্তি তার মনের ভাব মাতৃভাষাতেই প্রকাশ করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ যত সহজ মনে হয় অন্য ভাষা তত সহজ মনে হয়না। কিন্তু সেই মায়ের ভাষাকে কেড়ে নিতে হায়নার দল উঠেপড়ে লেগেছিলো। পাকিস্তানী পাঞ্জাবী মানুষজন ভাতের বদলে রুটি খায় তাই এইদেশে সোনালী ধান চাষ বন্ধ করে গম ফলাও। যদিও এই গম ফলুক না ফলুক এইটা ব্যাপার না। তারা চেয়েছিলো জোর করে উর্দুকে বাঙালীর উপর চাপিয়ে দিতে। তাদের চিন্তা ছিলো ভাষার মাধ্যমে বাঙালীর চেতনাকে ধবংস করে দিতে। উর্দু যদি পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হতো তাহলে চাকুরীর ক্ষেত্রে বাঙালীরা বৈষম্যের স্বীকার হতো অলিখিতভাবেই। কারণ চাকুরীর ভাষা হতো উর্দু আর বাঙালীর ভাষার দিক থেকে পিছিয়ে পড়তো। পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার ভাষাও হবে উর্দু এতে করে বিশাল সংখ্যক শিক্ষকের যোগান দিতে হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। এতে করে বাঙালীদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে বৈষম্যের স্বীকার হতে হতো চাকুরীতে। পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে বই-পুস্তকের ভাষাও করতে হতো উর্দু তাই এতো সংখ্যক বাংলার ছাপা তখন সম্ভব হতোনা বই আনতে হতো লাহোর থেকে। প্রশাসনিক চাকুরীর ক্ষেত্রে উর্দু জানা মানুষগুলোর মূল্যায়ন বেশী হতো। অফিস, আদালতের ভাষাও উর্দু হতো তাই বাঙালীদের মধ্যে উর্দুতে শক্তিশালী দখল না থাকার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানীরা একচেটিয়া দখলদারিত্ব করতো পূর্ব পাকিস্তান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষের উপর যদি দেশের উন্নতি নির্ভর করে, তবে মাতৃভাষা ছাড়া আর কোন গতি নাই। বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছিলেন, শুধু নিজ দেশে নয়, বিদেশে গেলেও বড় বড় রাজনীতিবিদ মাতৃভাষা বক্তৃতা দিতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভাষার কারণে একটা জাতিতে বিভক্তি সৃষ্টি হয় যেমনটি হয়েছিলো ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের হাত থেকে মুক্তির পরে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী চেয়েছিলো উর্দুকে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্র ভাষা করতে। চৌধুরী খালেকুজ্জামানের মতো নেতা বিবৃতি দেন, হবু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু (১৭ মে ১৯৪৭)। এ যেন শাসক গোষ্ঠী চাপিয়ে দেয়া হুকুম বাঙালীর উপর। বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ শাসক গোষ্ঠীর একচেটিয়া দখলদারিত্ব। বাঙালী বুদ্ধিজীবী লেখকগণ বরদাস্ত করতে না পেরে শক্ত হাতে কলম ধরেন। এইরকম একটা সম্পাদকীয়র কিছু অংশ, একটি দেশকে পুরোপুরি দাসত্বে রূপান্তরিত করার জন্য সম্রাজ্যবাদীদের যতরকম অস্ত্র আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্নক এবং ঘৃণ্য অস্ত্রা হচ্ছে সেই দেশের মাতৃভাষাকে পরিবর্তন করে একটি বিদেশী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত করা (সাপ্তাহিক মিল্লাত)। মাসিক পত্রিকা কৃষ্টিতে ছাপা হয় ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রবন্ধ এতে লেখা হয়, উর্দু বাহিয়া কি আসিবে পূর্ব- পাকিস্তানবাসীর মরণ-রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি। কাজী মোতাহের হোসেন লিখেছিলেন যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালী হিন্দু- মুসলমানের উপর রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাবার চেষ্টা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হইবে। লেখনির মাধ্যমে বাঙালী তার চেতনার শক্তি জাগিয়ে তুলে শাসকের মসদের কলমের দ্বারা আঘাত করে। এক পর্যায়ে পাকিস্তান চায় গায়ের জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর উপর চাপিয়ে দিতে উর্দুকে। সময় তখন ২১ মার্চ ১৯৪৮ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষণদানকালে ঘোষণা করেন ঃ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দু। যারা এর বিরোধীতা করে ও প্রদেশিকতাকে প্রশ্রয় দেয় তারা পাকিস্তানের দুশমন। এই সব রাষ্ট্রদোহীকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। বিদেশী চর কমিউনিস্টদের থেকে জনগণকে সতর্ক থাকার আহবান জানান। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সমাবর্তনে তিনি একই কথা বললে ছাত্রদের মধ্য থেকে বিশাল অংশ নো নো বলে চিৎকার করতে থাকে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে শেরে বাংলা ফজলুল হক জিন্নাহর অগণতান্ত্রিক বাংলা বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। শুরু হলো ছাত্র জনতার আন্দোলন শুরু হয় সভা সমাবেশ, ইসতেহার বিতরণ। ৩১ জানুয়ারী ছাত্রলীগ যুবলীগের উদ্যোগে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠীত কর্মীসভায় গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ব্যাপক প্রস্তুতি। পাকিস্তান সরকার শুকনো বারুদের আগুন লাগিয়ে দেয় ১৪৪ ধারা ঘোষণার মাধ্যমে। ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মিছিল দিতে থাকে ১৪৪ ধারা মানিনা মানবো না। পাকিস্তানী নরপশুরা ছাত্রজনতান আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার জন্য বেপরোয়া চরিত্রে আবতরণ হয় বুলেটের আঘাতে রক্তাক্ত হয় ঢাকার পিচঢালা রাজপথ। পাকিস্তানিদের হাতে শহীদ হোন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত। সালাম, রফিকের হত্যার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী কফিনের শেষ পেরেক টুকে দেয়। অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মতো জ্বলে উঠতে থাকে প্রতিশোধের শক্তি। সালাম, রফিক, জব্বারের আত্নহুতির বিনময়ে একুশ হয়ে উঠে বাঙালীর চেতনা, বাঙালীর শক্তি। বাঙালীর শোকের দিন, প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীকী দিবস। ১৯৫৩ সন থেকে প্রভাতফেরীসহ ২১ ফেব্রুয়ারী পালিত হতে থাকে দেশব্যাপী সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে। ৫২ থেকে শুরু হয় ৬২, ৬৬,৬৯,৭০, ১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে লক্ষ মায়ের ইজ্জতের বিনময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। নতুন সূর্যে আলোকিত হয় লাল সবুজের পতাকা। একুশ মানে চেতনা, একুশ মানে সংগ্রাম, একুশ মানে প্রতিবাদ। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে যাক সালাম, রফিক,জব্বার, বরকতসহ লক্ষ শহীদের বাংলাদেশ।লেখক: সাবেক দপ্তর সম্পাদক
হৃদয়ে একাত্তর ফাউন্ডেশন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২০
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com