প্রচ্ছদ

যুক্তরাষ্ট্র আ’লীগ সভাপতির অপসারণ দাবীতে সমাবেশ

প্রকাশিত হয়েছে : ১২:১১:০৪,অপরাহ্ন ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

ডেস্ক নিউজ  

অসাংগঠনিক তৎপরতা-স্বেচ্ছাচারিতা-পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মিছিল করতে যেয়ে গ্রেফতার হবার মিথ্যাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানকে অপসারণ এবং সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি দাবিতে ৮ সেপ্টেম্বর রোববার নিউইয়র্কে আওয়ামী পরিবারের কর্মী সমাবেশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ব্যানারে জ্যাকসন হাইটসে পালকি পার্টি সেন্টারের এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মিসবাহ আহমেদ এবং পরিচালনা করেন শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক ফরিদ আলম। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এবং জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার প্রতিবাদ কর্মসূচি চালাতে গিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত (বাকসুর জিএস) ড. প্রদীপ রঞ্জন কর।
কর্মী সমাবেশের সূচনা ঘটে ‘নো মোর সিদ্দিক’ স্লোগানে। গতবছর সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে শেখ হাসিনার নাগরিক সংবর্ধনা সমাবেশে ড. সিদ্দিকুর রহমানকে অপসারণের দাবিতে অধিকাংশ সময়ই এই স্লোগানে উত্তপ্ত ছিল সমাবেশ। নির্বাচনসহ নানাবিধ কারণে সেই দাবি পূরণ হয়নি বিধায় পুনরায় সেই স্লোগান উঠেছে।
জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মার মাগফেরাত এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় ইমাম কাজী কায়্যুমের নেতৃত্বে। আলোচনা পর্ব শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয় রুমানা আকতারের নেতৃত্বে। এরপর সকলে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করেন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
পেনসিলভেনিয়া, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, বস্টনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দলীয় কর্মীরা লাল-সবুজের টি শার্ট পরে জয়-বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানসহ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন। সকলের গলায় ঝোলানো ছিল দলীয় পরিচয়পত্র।
লিখিত বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট শাহ মো. বখতিয়ার ১৭টি অভিযোগ উপস্থাপনের পর বিপুল করতালির মধ্যে ড. সিদ্দিকের অপসারনের দাবি পোক্ত হয়। সুদূর এই প্রবাসে বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ার আগেই অরাজনৈতিক তৎপরতায় লিপ্ত সিদ্দিককে সরিয়ে নতুন কমিটির দাবি উঠে সমস্বরে। এ সময় শাহ বখতিয়ার উল্লেখ করেন, ৩ বছরের জন্যে অনুমোদিত কমিটির বয়স ৮ বছর অতিক্রম করছে। অভিযোগের অন্যতম হচ্ছে: সভাপতি শেখ হাসিনার অনুমোদিত কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৭৬। গত ৮ বছরে পছন্দের লোকদের সম্পূর্ণ অসাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় পদায়নের মাধ্যমে তা ১৭৩ এ উঠেছে। এ ব্যাপারে সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে থেকে অনুমোদনের প্রয়োজনবোধ করেননি। বলা হয়, ‘যারাই তার অসাংগঠনিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন তাদেরকেই বহিষ্কারের নোটিশ জারি হচ্ছে। আবার গোপনে তা প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটছে।’ লিখিত অভিযোগের মধ্যে আরো রয়েছে, ‘নিজেকে নেত্রীর সমতুল্য ঘোষণা করে দম্ভ প্রকাশ করেছেন দলীয় সভায় যে, শেখ হাসিনা ৪০ বছর সভাপতি থাকতে পারলে আমি আরো ৪ বছর পারবো না কেন?’ অভিযোগ করা হয়েছে, গত ৮ বছরে কার্যকরী কমিটির মাত্র ৩টি সভা আহবান করা হলেও প্রত্যেকটি অসমাপ্ত অবস্থায় শেষ হয়েছে। সবকটিতেই বিশেষ নিরাপত্তা রক্ষী ভাড়া করা হয় ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের দমনে। কোন কোন সময় পুলিশ ডাকাডাকির ঘটনাও ঘটেছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অন্যতম প্রধান বলিষ্ঠ কলামিস্ট আব্দুল গাফ্্ফার চৌধুরিকেও নিউইয়র্কে অপমানের জঘন্য চেষ্টা চালিয়েছিলেন ড. সিদ্দিকুর রহমান। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের ব্যানারে হাস্যরসের মহড়া দিয়েছেন সস্ত্রীক এই সিদ্দিকুর রহমান। সেই ভিডিও ভাইরাল হবার পরও নিজ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দূরের কথা, সম্প্রতি ঢাকায় গিয়ে হাত-পা ধরে সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন শাহ বখতিয়ার।
অতিসম্প্রতি বগুড়ার একটি শূন্য আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে নিজের বায়োডাটা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারের সময় সিদ্দিকুর দাবি করেছেন যে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশ কৃষিবিদ্যালয়ে মিছিল করার সময় তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। এমন দাবি নির্জলা মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐ সময়ের শহীদ নাজমুল আহসান হল ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ১৯৭৯ সালে বাকসু নির্বাচনে জিএস পদে জয়ী ড. প্রদীপ রঞ্জন কর। প্রদীপ কর এই কর্মী সমাবেশে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদানের সময় সিদ্দিকুরকে মিথ্যাবাদি, ভন্ড, প্রতারক হিসেবে অভিহিত করেন। ‘কারণ তিনি কখনোই ছাত্রলীগের প্রাথমিক সদস্যও ছিলেন না। পঁচাত্তরের আগস্টে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি শিক্ষক সমিতির নেতা ছিলেন। তবে সেটি কোন রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। কিংবা পছাত্তরের ১৫ আগস্টে কৃষিবিদ্যালয়ে কোন মিছিল হয়নি, করার চেষ্টাও করা হয়নি কিংবা কেউ গ্রেফতারও হননি। সবটাই মিথ্যা’-উল্লেখ করেন প্রদীপ কর।

সিদ্দিকুরের নির্জলা মিথ্যাচার প্রসঙ্গে এই সমাবেশে বক্তব্যকালে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন তালুকদার বলেছেন, ‘১৯৬৪ সালে সিদ্দিকুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আমি তার ৪ বছরের জুনিয়র। কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালু হয় ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময়। সেই সময় গঠিত ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিলেন মানিকগঞ্জের রহমতউল্লাহ। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। আমি ছিলাম সদস্য। কখনো সিদ্দিকুরকে কোন কর্মকান্ডে দেখিনি বা সমর্থক হিসেবে তার নামও শুনিনি। অধিকন্তু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে সিনিয়রদের কাছে জেনেছি যে, সিদ্দিকুর নিয়মিতভাবে ক্লাস করেছেন। পরীক্ষা দিয়েছেন। এমনকি স্টাইপেন্ডের টাকাও ড্র করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাননি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন জিয়াউর রহমানের আমলে। সেটি ছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে না যাবার পুরস্কার।’
ড. প্রদীপ রঞ্জন কর উল্লেখ করেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সকালে আমার রুমে আক্রমণ করার পরই জানতে পারি জাতিরজনককে হত্যার সংবাদ। সে সময় পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে ভাব, ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছিল। কোন ধরনের মিছিলের সুযোগ হয়নি।
প্রদীপ রঞ্জন কর বলেন, ১৯৭৯ সালে বাকসু নির্বাচনে আমি ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে জিএস হই। সে সময় জিয়ার রাজত্ব। তাই বলে আমরা থেমে থাকিনি। সাংগঠনিক কর্মকান্ডসহ বঙ্গবন্ধু হত্যার নিন্দা, প্রতিবাদে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সংগঠিত হচ্ছিলেন, এমনি সময়ে আমাকে জিএস থাকাবস্থায়ই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কহিষ্কার করা হয়। প্রদীপ কর দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টার যাচাই করলেই সিদ্দিকুরের একাত্তরের ভ’মিকা দিবালোকের মত উদ্ভাসিত হবে। তাই এমন মিথ্যাবাদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব থেকে সরানোর বিকল্প নেই।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সক্রিয় বর্তমানের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক আইরিন পারভিন বলেন, ‘আমি সাংগঠনিক স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ সবসময়েই করে আসছি। এজন্যে সিদ্দিকুর রহমান আমাকেও শো’কজ নোটিশ দিয়েছিলেন। এরপর তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু তার বেপরোয়া আচরণে প্রবাসে আওয়ামী পরিবার আজ ত্যক্ত-বিরক্ত। সংগঠনকে তিনি পকেটে ভরেছেন। যা খুশী তাই করছেন। সাংগঠনিক পদবি ব্যবহার করে ঢাকায় গিয়ে চাঁদাবাজি করছেন তিনি অনেকদিন থেকেই। এমনকি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য কমিটি গঠনেও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। তার মত নেতৃত্ব সরানো দরকার বঙ্গবন্ধুর গড়া এই সংগঠনকে রক্ষার স্বার্থে।
সভা সঞ্চালনাকালে প্রদত্ত বক্তব্যে ফরিদ আলম বলেন, ‘নানাবিধ কারণে নিজের গ্রহনযোগ্যতাকে ধুলিসাত করেছেন সিদ্দিকুর রহমান। একজনের বিরুদ্ধে আরেকজনকে ক্ষেপিয়ে তোলার ঘটনাবলী ফাঁস হয়ে পড়ায় সকলেই ক্ষুব্ধ সিদ্দিকুরের বিরুদ্ধে। তাই এমন লোক দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নাগরিক সমাবেশ করা কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। তাই এমন একজনের নেতৃত্বে ঐ সংবর্ধনা সমাবেশ হওয়া উচিত যেখানে মুজিব আদর্শে উজ্জীবিত প্রতিটি প্রবাসী সপরিবারে যোগদানে দ্বিধা করবেন না।’
একইদাবিতে আরো বক্তব্য রাখেন এবং মঞ্চে উপবেশন করেন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মমতাজ শাহনাজ, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চন্দন দত্ত, শিক্ষা সম্পাদক এম এ করিম জাহাঙ্গির, নির্বাহী সদস্য হিন্দাল কাদির বাপ্পা, শরিফ কামরুল হীরা, কায়েকোবাদ খান, ইলিয়ার রহমান, সাবু মিয়া, লিটন গাজী, আশরাফ মাসুক, পেনসিলভেনিয়া স্টেট আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হাই, যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসে চঞ্চল, জামাল হোসেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হাকিকুল ইসলাম খোকন, হাজী শফিকুল আলম, এম এ জলিল, তোফায়েল চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি আশরাফউদ্দিন, শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি মঞ্জুর চৌধুরী, শেখ হাসিনামঞ্চের সভাপতি জালালউদ্দিন জলিল, আওয়ামী লীগ নেতা আলী আক্কাস, হেলাল মাহমুদ, সিরাজুল ইসলাম, মাঈনউদ্দিন, স্টেট আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. আলমগীর, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ফরিদা আরভি প্রমুখ।
এই দাবির সাথে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের বর্তমান কার্যকরী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই একমত পোষণ করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্যে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আসবেন সংগঠনের সভাপতি শেখ হাসিনা। ২৯ সেপ্টেম্বরে দেশের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগের আগের দিন দুপুরে নাগরিক সংবর্ধনা সমাবেশে ভাষণ দেয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর। সেখানেই কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি দেখার প্রত্যাশা সকলের। এ ব্যাপারে দলীয় প্রধানের সদয় দৃষ্টি কামনা করা হয়েছে এই কর্মী সমাবেশ থেকে।
এদিকে, সোমবার অপরাহ্নে প্রাপ্ত সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী সিদ্দিকুর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যার পাশাপাশি শেখ হাসিনার সফরের আলোকে ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। প্রচার সম্পাদক হাজী এনাম দুলাল মিয়া জানিয়েছেন এ তথ্য।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com