প্রচ্ছদ

পাওনা টাকার জেরে সিলেট জিন্দাবাজারে আ’লীগ নেতা আব্দুল আহাদকে খুন করা হয়

প্রকাশিত হয়েছে : ২:০৮:০৭,অপরাহ্ন ১১ জুন ২০১৯ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

স্টাফ রিপোর্টঃ

পাওনা টাকা পরিশোধের কথা বলে নগরীর জিন্দাবাজারে ডেকে এনে কুয়েত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আব্দুল আহাদকে খুন করা হয়। কুয়েত প্রবাসী দেনাদার হোসেন মুরাদ চৌধুরীর পরিকল্পনায় তিনি খুন হন। প্রকাশ্যে সংঘটিত এই কিলিং মিশনে অংশ নেয় ৫ জন। পরিকল্পনার পর হত্যাকান্ডের আগেই দেশ ছাড়েন মুরাদ। আর হত্যাকান্ডের পর মাহমুদুর রহমান লায়েক ভারতে ও সোহেল আহমদ জালাল দুবাইয়ে পালিয়ে যান। আদালতে দেয়া অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আব্দুল আহাদ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি আলোচিত এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক অনুপ কুমার চৌধুরী আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কুয়েত প্রবাসী মুরাদের পরিকল্পনায় ৫ জন মিলে আব্দুল আহাদকে প্রকাশ্যে হত্যা করে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সহকারে মুরাদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, আব্দুল আহাদ প্রায় ২০ বছর ধরে কুয়েতে বসবাস করে আসছিলেন। কুয়েত কর্মস্থলে কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল। একজন সংগঠক হিসেবে তার পরিচিতিও ছিল। তিনি কুয়েত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় লেখক ফোরাম কুয়েত’র সাধারণ সম্পাদক ও ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি কুয়েত ওসমানী স্মৃতি পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন। হোসেন মুরাদ চৌধুরীও একজন কুয়েত প্রবাসী। কুয়েতে বসবাসকালে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়। মুরাদ জাতীয় পার্টির কর্মী ছিলেন। দু’জনের মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধও ছিল। দু’জন একই এলাকার ও পূর্ব পরিচিত হওয়ায় এস এম আব্দুল আহাদ তাকে (মুরাদ)আর্থিক সহায়তা করতেন। আহাদের নিকট থেকে টাকা পয়সা ধারও নিতেন মুরাদ চৌধুরী। কিন্তু সময়মতো টাকা পরিশোধ করতেন না মুরাদ। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

টাকা খোঁজায় মার্ডারের প্ল্যান
পাওনা টাকা খোঁজার কারণে আব্দুল আহাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন মুরাদ। পাওনা টাকা না দিয়ে উল্টো তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট আব্দুল আহাদ কুয়েত থেকে দেশে আসেন এবং মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার মেদেনীমহল এলাকায় নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে বসবাস করতে থাকেন। ৩০ আগস্ট সিলেট নগরীর রেজিস্ট্রি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায়ও যোগ দেন। জনসভা শেষে নিজ বাড়িতে ফিরে যান। অন্যদিকে ৬ এপ্রিল দেশে আসেন মুরাদ। এ সকল তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, এস এম আব্দুল আহাদকে হত্যার পরিকল্পনা করে ২৩ আগস্ট মুরাদ চৌধুরী পুনরায় কুয়েতে চলে যান।

ডেকে আনা হয় সিলেটে
নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় অংশ গ্রহণের পর ৩০ আগস্ট সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে চলে যান আব্দুল আহাদ। ঐদিন রাত প্রায় ১২ টায় ফখরুল ইসলাম শান্ত আব্দুল আহাদকে মোবাইলে কল করে জানায়, হোসেন মুরাদ চৌধুরীর নিকট থেকে তার পাওনা টাকা নিয়ে যেতে। পাওনা টাকা নিয়ে যেতে ৩১ আগস্ট নিজ বাড়ি থেকে বের হন আহাদ। হযরত শাহজালাল (রহঃ) মাজার মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে হযরত শাহপরান (রহঃ) মাজার জিয়ারত করেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই লায়েক, শান্ত ও জালালরা আব্দুল আহাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকে। টাকা দেয়ার কথা বলে মূলত হত্যার উদ্দেশ্যেই এস এম আব্দুল আহাদকে সিলেটে ডেকে আনা হয়।

কিলিং মিশনে ৫ জন
এ ঘটনায় গোলাপগঞ্জের উত্তর রায়গড়ের কামরুল হাসানের পুত্র মুরাদ হোসাইন রানাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর সে আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সে বলেছে, হত্যাকান্ডে জালাল, লায়েক ও আরেকজন আব্দুল আহাদকে কুপাচ্ছে বলে সে দেখেছে বলে স্বীকার করলেও নিজের কথা বলেনি। তবে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ৩১ আগস্ট রাত পৌনে ১০টায় জিন্দাবাজার তাঁতীপাড়ার গলির মুখে রিয়েল টেস্ট ¯œ্যাক্স এর সামনে মাহমুদুর রহমান লায়েক ধারালো চাকু দিয়ে আব্দুল আহাদের পিঠের ডান পাশে, ফখরুল ইসলাম শান্ত পিঠের বাম পাশে, সোহেল আহমদ জালাল কোমরের নিচে ও মলদ্বারের নিচে এবং মুরাদ হোসাইন রানা কোমরের নিচে একাধিক ঘাই মেরে রক্তাক্ত জখম করে। অভিষেক চক্রবর্তীও এলোপাতাড়ি কুপাতে থাকে। আহাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতকরা পালিয়ে যায়। আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের ৯ নং ওয়ার্ডের (বেড নং এক্স-৩০, রেজিঃ নং-২৮১৪৩) রাত ১১ টা ১০ মিনিটের সময় আব্দুল আহাদ মারা যান।

৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রাসনা বেগম বাদী হয়ে ২ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১। এ ঘটনায় ওলামালীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম সুরুকীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। ফখরুল ইসলাম শান্ত ও মুরাদ হোসাইন রানাকেও গ্রেফতার করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৬ জনকে আসামী করে গত ১৬ এপ্রিল আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযোগপত্র নং-১৩৫/১৯। আসামীরা হলেন, দক্ষিণ সুরমার সাধুর বাজারের তারা মিয়ার পুত্র ফখরুল ইসলাম শান্ত (৩৬), বিয়ানীবাজারের মাথিউরা বাজারের আব্দুল মালিকের পুত্র মাহমুদুর রহমান লায়েক (২৮), গোলাপগঞ্জের উত্তর রায়গড়ের কামরুল হাসানের পুত্র মুরাদ হোসাইন রানা (২৫), ফেঞ্চুগঞ্জের কটালপুরের (বর্তমানে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল, স্টাফ কোয়ার্টার) ফিরোজ আহমদের পুত্র সোহেল আহমদ জালাল (২৭), বিয়ানীবাজারের চারখাই জালালনগরের ময়নুল হোসাইন চৌধুরীর পুত্র হোসেন মুরাদ চৌধুরী (৪১) ও সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সূর্যেরগাঁও এর আশীষ কুমার চক্রবর্তীর পুত্র অভিষেক চক্রবর্তী প্রকাশ মিথুন (২৫)। ৬ আসামীর বিরুদ্ধে দন্ডবিধি ৩০২/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া সিরাজুল ইসলাম সুরুকী ও শহিদুল ইসলাম মামুনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

৩ জন দেশ ছেড়েছেন
অভিযোগপত্রে বলা হয়, তদন্তকালে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মামলার আসামী হোসেন মুরাদ চৌধুরী ২০১৮ সালের ৬ এপ্রিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেন। একই বছরের ২৩ আগস্ট একই বিমানবন্দর দিয়ে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। অপর আসামী মাহমুদুর রহমান লায়েক হত্যাকান্ডের পর ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। কিন্তু দেশে আগমনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আরেক আসামী সোহেল আহমদ জালাল ২৪ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করলেও লায়েকের মতো জালালও দেশে ফিরে আসেনি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্রুত ন্যায় বিচারের দাবি
নিহত আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আব্দুল আহাদের স্ত্রী ও হত্যা মামলার বাদী রাসনা বেগম দ্রুত ন্যায় বিচার পেতে সরকারের নিকট দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, স্বামী হারিয়ে আমি এখন অসহায়। কিছু চাই না-শুধু স্বামীর খুনীদের ফাঁসি চাই।

তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক অনুপ কুমার চৌধুরী সিলেটের ডাককে বলেন, ঘটনাটি নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনাকারী ঘটনার আগেই দেশ ছাড়ে। হত্যাকান্ডের পর দুই ঘাতক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সকল তথ্য-উপাত্তসহ অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। আদালত পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com