প্রচ্ছদ

ক্ষোভ থেকেই আইনজীবী আবিদাকে হত্যা করেন তানভির

প্রকাশিত হয়েছে : ৮:২৮:২৬,অপরাহ্ন ০১ জুন ২০১৯ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় নারী আইনজীবী আবিদা সুলতানাকে (৩৫) হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মসজিদের ইমাম তানভির আলম (৩০)।

শুক্রবার (৩১ মে) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বড়লেখার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হরিদাস কুমারের আদালতে ১৬৪ ধারায় তিনি এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আবিদা হত্যা মামলায় তানভির আলম ১০ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

রিমান্ডের ৪র্থ দিন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ায় তানভির আলমকে মৌলভীবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। তানভীর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ছিল্লারকান্দি গ্রামের ময়নুল ইসলামের ছেলে। ৪ মাস আগে নিহত আবিদা সুলতানাদের পারিবারিক মসজিদের ইমাম হিসেবে তিনি চাকরি নেন।

পুলিশ জানিয়েছে, তানভির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কিভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ও কি কারণে হত্যা করেছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ক্ষোভ থেকে একাই হত্যা করেছেন জানিয়ে তানভির জবানবন্দিতে বলেছেন, মসজিদের গাছ কাটা ও বিভিন্ন ইস্যুতে ঘটনার দিন আবিদার সাথে তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। তখন পানির ফিল্টারের ঢাকনা সামনে ছিল। ঢাকনা দিয়ে সজোরে মাথায় আঘাত করেন তানভির। আঘাতে আবিদার মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান আবিদা। এরপরে আবিদার মুখ ও গলা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন।

গত রোববার (২৬ মে) মধ্যরাতে বড়লেখায় ঘরের ভেতর থেকে নারী আইনজীবী আবিদা সুলতানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সোমবার রাতে বড়লেখা থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন আবিদার স্বামী মো. শরিফুল ইসলাম বসুনিয়া।

মামলার আসামিরা হচ্ছেন- আবিদা সুলতানার বাবার বাসার ভাড়াটিয়া তানভির আলম (৩৪), তানভিরের ছোট ভাই আফছার আলম (২২), স্ত্রী হালিমা সাদিয়া (২৮) এবং মা নেহার বেগম (৫৫)। তাদের স্থায়ী ঠিকানা সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ছিল্লারকান্দি। মঙ্গলবার (২৮ মে) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তিন আসামী রিমান্ডে নেয় পুলিশ। প্রধান আসামী তানভির আলমের ১০ দিন এবং তাঁর স্ত্রী সাদিয়া ও মা নেহার বেগমের আটদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তানভিরের ছোটর ভাই আফছার পলাতক।

পুলিশ, নিহতের পরিবার, মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউপির মাধবগুল গ্রামের মৃত আব্দুল কাইয়ুমের তিন মেয়ে। তাঁর স্ত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন। তিনি দ্বিতীয় মেয়ের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে থাকেন। মেয়েদের মধ্যে আবিদা সুলতানা (৩৫) সবার বড়। তিনি মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী। আবিদার স্বামী মো. শরিফুল ইসলাম বসুনিয়া একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি স্বামীর সঙ্গে মৌলভীবাজার শহরে বসবাস করতেন।

ছুটির দিনে বাবার বাড়ি দেখাশোনা করতে সেখানে যেতেন। গত রোববার (২৬ মে) আবিদা সুলতানা বোনের বাড়ি বিয়ানীবাজার ছিলেন। ওইদিন (গত রোববার) সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টায় জরুরি প্রয়োজনে তিনি বাবার বাড়িতে আসেন। বাবার বাড়ি আসার পর বিকেল পাঁচটার দিক থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর আবিদা সুলতানার স্বামী ও বোনরা তাঁকে খুঁজতে বাবার বাড়ি মাধবগুল গ্রামে আসেন। বাড়িতে এসে তারা ঘরের কক্ষ বন্ধ দেখতে পান। চার কক্ষবিশিষ্ট বাসার দুই কক্ষে আবিদা সুলতানা ও তাঁর বোনরা বেড়াতে আসলে থাকেন। বাকি দুটোতে ভাড়া থাকতেন তানভির আলমের পরিবার।

তিনি তাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ও আবিদাদের মসজিদের ইমাম। এসময় তানভির আলমের পরিবারের কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তারা ঘটনাস্থলের পাশেই তাদের এক আত্মীয় বাড়িতে ছিলেন। পরে ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে চাবি এনে ওইদিন (গত রোববার) রাত ১০টার দিকে পুলিশ ঘরের দরজা খুলে দেখে আবিদা সুলতানার মৃতদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। পুলিশ ওইদিনই তানভির আলমের স্ত্রী ও মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে।

তানভির আলমকে গত সোমবার (২৭ মে) দুপুরে শ্রীমঙ্গলের বরুণা এলাকা থেকে আটক করা হয়। এই ঘটনায় আবিদা সুলতানার স্বামী মো. শরিফুল ইসলাম বসুনিয়া আটক তিনজনসহ চারজনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে বড়লেখা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ আটকৃতদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।

কে এই তানভির: সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ছিল্লারকান্দি গ্রামের ময়নুল ইসলামের ছেলে তানভীর আলম। স্থায়ী ঠিকানা সিলেটের জকিগঞ্জ হলেও কয়েক বছর ধরে বড়লেখা উপজেলার চরকোনা গ্রামে বসবাস করত। নিজের এলাকায় বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত ছিলেন এই তানভির। খোঁজ নিয়ে এমনিটি জানা গেছে। মাত্র ৪ মাস আগে নিহত আবিদা সুলতানার পিতার তৈরি করা পারিবারিক মসজিদের ইমাম হিসেবে তিনি চাকরি নেন।

এর আগে বড়লেখার বরইতলি নামক এলাকায় একটি মসজিদে ইমামতি করলেও মসজিদ কমিটি সেখান থেকে বের করে দেয়। নতুন কর্মস্থল মসজিদে যোগদানের পর স্ত্রী, মা ও ছোটভাইকে নিয়ে নিহত আবিদা সুলতানার বাবার বাসায় নামমাত্র ভাড়ায় বসবাস করতেন।

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াছিনুল হক আদালতে তানভির আলমের স্বীকারোক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে শনিবার (১ জুন) বলেন, ‘হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী সে একাই হত্যা করেছ। মসজিদের গাছ কাটা নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে পানির ফিল্টারের ঢাকনা দিয়ে উপর্যপুরি আঘাত করে। এই আঘাতে আবিদা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এরপর তানভির তাকে হত্যা করে।

রিমান্ডে তানভীরের দেওয়া বক্তব্য মতে ভিকটিমের মুঠোফোন, সিম উদ্ধার করা হয়েছিল। হত্যার পর ঘর তালাবদ্ধ করে রাখে। তালার চাবিও উদ্ধার করা হয়েছে। রিমান্ডে থাকা তানভিরের মা ও স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনার সাথে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

ওসি আরো জানান, স্বীকারোক্তিতে একা হত্যার যে কথা বলেছে প্রয়োজনে যাচাই বাচাই করা হবে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার নেপথ্যে অন্য কেউ যুক্ত রয়েছে কিনা তাও পুলিশ খতিয়ে দেখছে

মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় শনিবার বিকেলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) রাশেদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে স্বীকারোক্তির বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com