ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবি: মাদারীপুরে নিহতদের পরিবারে আহাজারি

প্রকাশিত: ৩:৩৩ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৯

ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবি: মাদারীপুরে নিহতদের পরিবারে আহাজারি

সাগরপথে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় মাদারীপুরের নিহত জাকির হোসেন (২৮) ও সজীব হোসেনের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন সদর উপজেলার মনির হোসেন মাতুব্বর (২২) নাদিম মাতুব্বর (১৭), সাইফুল ইসলাম (২৪) ও রাজৈর উপজেলার নাঈম সিকদার (১৯) নামের ৪ যুবক।

নিহত জাকির হোসেন শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের ৮নং চরগ্রামের সেকান্দার হাওলাদারের ছেলে এবং সজীব হোসেন সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের উত্তর শিরখাড়া গ্রামের আজিজ শিকদারের ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে পরিবারের মুখে হাসি ফোঁটাতে অর্থ উপার্জনের জন্য নূর-নবী খলিফা ও নূর ইসলাম খলিফা নামের দুই দালালের হাত ধরে বিদেশে পাড়ি জমায় জাকির।

জাকিরকে স্থলপথে তুরস্ক নেয়ার কথা থাকলেও দালাল চক্র লিবিয়া নিয়ে জিম্মি করে। লিবিয়ায় জাকির হোসেনকে আটকে রেখে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় টাকা দাবি করে তারা। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই ছেলেকে বিক্রি করে দেবে অথবা অনাহারে রাখবে বলে হুমকি দিতে থাকে। এ পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা দালালচক্রের কাছে দেয় নিহতের পরিবার।

গত বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে লিবিয়ার উপকূল থেকে ৭৫ অভিবাসী নিয়ে ইতালির উদ্দেশে রওনা দিয়ে নৌকাডুবিতে প্রায় ৩৭ বাংলাদেশি নিহতের খবর পাওয়া যায়।

জাকির হোসেনকে হারিয়ে এখন দিশাহারা স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের লোকজন। স্বামীকে হারিয়ে কান্না যেন থামছেই না স্ত্রী শান্তা আক্তারের। অবুঝ দুটি কন্যাসন্তানকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা নেই পরিবারের লোকজনের।

এদিকে সন্তান নৌকাডুবিতে নিহত হওয়াকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না নিহত জাকিরের বাবা-মামা।

এ ছাড়া সজীবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে মানুষের ভিড়। সজীবের মা ও বোন যেন একটু পর পরই সজীবের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেই যাচ্ছেন। সজীবের মা মোবাইল হাতে নিয়ে বারবার বলছিলেন- ছেলে সজীবের সঙ্গে তার শেষ কি কথা হয়েছিল? তার ছেলে আর বেঁচে নেই এটি কিছুতেই যেন মানতে পারছেন না মা। শোকময় পরিবারটি এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের মধ্যেও বইছে শোকের মাতম।

সজীবের স্বজনরা জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়েই গত ঈদের পরের দিন এক দালালের হাত ধরে লিবিয়া যায় সজীব। এর পর লিবিয়ায় ছয় মাস কাজ করার পর নোয়াখালীর রুমান নামে এক দালালের খপ্পরে পড়ে সজীব।

সেই দালাল আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে সজীবকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। সজীব রাজি হয় তার সঙ্গে যেতে। এর পর দালাল আটকে রেখে সজীবকে লিবিয়ার জিম্মিদশায় বন্দি করে রাখে। সেখানে দীর্ঘ চার মাস পর গত বৃহস্পতিবার সজীবকে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া পৌঁছানোর কথা বলে নৌকায় তোলা হয়।

সজীবের বোন মিম আক্তার বলেন, ‘আমারে আফা কইয়া আর কে বোলাবো। আমার ভাইরে এক বছর রাইখা কেন বৃহস্পতিবার পাঠাইলি। আমি এহন কেমনে ভাইরে ভুইলা থাকমু রে। কোথায় গেলি সজীবরে। আমি আমার ভাইয়েরে না দেখা পর্যন্ত রোজা ভাঙ্গমু না।’

সজীবের সঙ্গে একই নৌকায় ছিল একই ইউনিয়নের আরও দুজন। তারা হলেন বল্লভদী গ্রামের আদেল উদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে মনির হোসেন মাতুব্বর (২২) ও শ্রীনদী এলাকার জোবায়ের মাতুব্বরের ছেলে নাদিম মাতুব্বর (১৭)। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে তারা নিখোঁজ রয়েছেন। এখন পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া একই ঘটনায় সদর উপজেলার খোয়াজপুর মঠেরবাজার এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৪), রাজৈর উপজেলার আলমদস্তার গ্রামের জাফর সিকদারের ছেলে নাইম সিকদার (১৯) নিখোঁজ রয়েছেন।

নিহতদের লাশ দেশে আনার পাশাপাশি নিখোঁজদের ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনরা।

এ ছাড়া দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মাদারীপুর শাখার যুবপ্রধান শিশির হোসেন বলেন, তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছে নৌকাডুবির ঘটনায় মাদারীপুরের কয়েকজনের নাম জানা গেছে। এর মধ্যে সজীব নামে একজনের নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আমরা নিহত ও নিখোঁজদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য নিয়েছি।

আর্কাইভ

নভেম্বর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com