প্রচ্ছদ

সুনামগঞ্জের হাওরে দুর্নীতি: পাউবোর ১৪ কর্মকর্তাসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

প্রকাশিত হয়েছে : ১:০৩:০০,অপরাহ্ন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

সুনামগঞ্জের হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলায় ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগপত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের ঠিকাদারদের আসামি করা হয়েছে।

রোববার কমিশনের সভায় অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, শিগগিরই বিচারিক আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২ জুলাই সুনামগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক ফারুক আহমেদ। মামলায় আসামি করা হয় ৬১ জনকে। একই কর্মকর্তা তদন্ত শেষে এজাহারভুক্ত ৩৪ জনকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে নতুন ৬ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে কমিশনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। মোট ৩৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেয় কমিশন।

দুদক বলছে, আসামিরা দেওয়ানি অপরাধের পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধ করেছেন বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ১৯ জন ঠিকাদার ও পাউবোর ১৪ কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে প্রতিবছর বন্যা আসার সময় ও আশঙ্কা সম্বন্ধে অবহিত থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি ৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। তাঁদের অর্থ আত্মসাৎ ও অবহেলার কারণেই হাওর অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় কৃষক ও জনসাধারণের আর্থিক ক্ষতি হয়।

এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে ২৭ জন অভিযোগপত্রে আসামি হচ্ছেন। তাঁরা হলেন সুনামগঞ্জে পাউবোর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দীন, সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খলিলুর রহমান, সাবেক সেকশন কর্মকর্তা মো. শহিদুল্লাহ, ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ খান, খন্দকার আলী রেজা, মো. শাহ আলম, মোহাম্মদ মাহমুদুল করিম, মো. মোছাদ্দেক ও সজিব পাল।

ঠিকাদারদের মধ্যে গুডম্যান এন্টারপ্রাইজের আফজালুর রহমান, এলএন কনস্ট্রাকশনের পার্থ সারথী পুরকায়স্থ, শেখ মো. মিজানুর রহমান, মাহবুব এন্টারপ্রাইজের আবুল মহসীন মাহবুব, নিয়াজ ট্রেডার্সের নিয়াজ আহমেদ খান, প্রীতি এন্টারপ্রাইজের মিলন কান্তি দে, আরআর ট্রেডিংয়ের খান মো. ওয়াহিদ রনি, সোয়েব এন্টারপ্রাইজের সোয়েব আহমেদ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের মো. ইউনুস, মো. আবদুল কাইয়ুম, আতিকুর রহমান, গোলাম সরোয়ার, নুরুল হক, শাহরিন হক মালিক, মোকসুদ আহমেদ, নুনা ট্রেডার্সের সাইদুল হক, এসআই প্রাইভেট লিমিটেডের কাজী হাসিনা আফরোজ ও শেখ আশরাফ উদ্দিন।

তদন্তে আরও ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী লিংকন সরকার, রঞ্জন কুমার দাস ও অনিক সাহা, সাবেক সেকশন কর্মকর্তা ইমরান হোসেন, নিহার রঞ্জন দাস এবং ঠিকাদার ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের মো. শরিফুল ইসলাম।

তদন্তে বাদ পড়েছেন পাউবোর ৩ প্রকৌশলী, ৩ সেকশন কর্মকর্তা ও ২৮ জন ঠিকাদার।
বাদ পড়া প্রকৌশলীরা হলেন সুনামগঞ্জ পাউবোর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাই ও সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস। সাবেক তিন সেকশন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, বরকত উল্লাহ ভূইয়া ও জাহাঙ্গীর হোসেনও বাদ পড়েছেন অভিযোগপত্র থেকে।

ঠিকাদারদের মধ্যে খন্দকার শাহীন আহমেদ, জিল্লুর রহমান, সজিব রঞ্জন দাস, এম এ হান্নান, খায়রুল হুদা চপল, কামাল হোসেন, কাজী নাছিমুদ্দিন, খন্দকার আলী হায়দার, আকবর আলী, রবিউল আলম, আবুল হোসেন, শিবব্রত বসু, মোজাম্মেল হক মুন, বাচ্চু মিয়া, বিপ্রেশ তালুকদার বাপ্পি, জামিল ইকবাল, চিন্ময় কান্তি দাস, খাইরুজ্জামান, মফিজুল হক, মোখলেছুর রহমান, রেনু মিয়া, শামসুর রহমান, আবদুল মান্নান, মাহতাব চৌধুরী, লুৎফুল করিম, হাজি মো. কেফায়েতুল্লাহ, হুমায়ুন কবির ও ইকবাল মাহমুদ এজাহারে আসামি থাকলেও অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়েছেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের এপ্রিলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। হাওরে ফসলহানির পর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর দুদক ১৩ এপ্রিল হাওরের ফসলহানি ও বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের তদন্তে দুদকের পরিচালক বেলাল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। এরপর ১৫ এপ্রিল পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিনকে সুনামগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ফসলহানির ঘটনায় ৩০ মে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২ মে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (উত্তর-পূর্বাঞ্চল) মো. আবদুল হাই, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম ও সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান শেষে ২ জুলাই মামলা হয়। মামলায় পাউবোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে অবৈধ যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়ে। আর ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ঠিক সময়ে কাজ শেষ না করে কৃষকদের ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পরের মাসে ৩ আগস্ট আরেকটি মামলা করে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি। সুনামগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে মামলাটি করেন সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল হক। এ মামলায় আসামি করা হয় ১৩৯ জনকে। দুদকের মামলার ৬১ আসামি এই মামলারও আসামি। এর বাইরে ৭৮ জন হলেন ৩৯টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর থেকে দুই মামলার অভিযোগসহ আসামির তালিকা একীভূত করে তদন্ত করে দুদক।

দুদক মামলা করার পরদিনই ঢাকা থেকে পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের বরখাস্ত হওয়া সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিন ও ইব্রাহিম ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর দেড় মাস পর ১৫ আগস্ট রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঠিকাদার খায়রুল হুদা ওরফে চপলকে গ্রেপ্তার করে দুদক। খায়রুল হুদা সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। তিনি এবারের উপজেলা নির্বাচনে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া বাচ্চু মিয়া ও খায়রুল হুদা তদন্ত শেষে আসামির তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

জেলা প্রশাসনে হিসাব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ওই সময় ১৫৪টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ কৃষক পরিবার।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com