প্রচ্ছদ

বৌভাত থেকে কনেকে তুলে নেয়ার চেষ্টা, ছাত্রলীগ কমিটি বিলুপ্ত

প্রকাশিত হয়েছে : ১১:০৪:২৩,অপরাহ্ন ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | সংবাদটি ৬৮ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

দেবীদ্বারে একটি বৌভাত অনুষ্ঠান থেকে সেখানকার কলেজ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে কনেকে তুলে নেয়ার চেষ্টার ঘটনায় ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের নিমসার কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ইসমাইল ও সহযোগী সাকিবের নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি দল শুক্রবার ওই নববধূকে তুলে নিতে গিয়েছিলেন।

এ সময় এসে এলাকাবাসী ও বরের লোকেজন তাদের আটক করে গণধোলাই দেয়।

ঘটনাটি ঘটে উপজেলার সাহারপাড় এলাকার মাঝি বাড়িতে শুক্রবার জুমার নামাজ চলাকালীন সময়ে।

ওই ঘটনায় ছাত্রলীগ সভাপতির কথিত প্রেমিকাসহ প্রায় ২৫ জন আহত হয়। এদের মধ্যে ১২ জনকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশকে খবর দেয়। দেবীদ্বার থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৭ জনকে আট করে নিয়ে আসে।

আটককৃতদের দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও জননী মেডিকেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

হামলা ও লুটপাট চালানোর সময় বাড়ির পুরুষ লোকজনের প্রায় সবাই মসজিদে জুমার নামাজ পড়ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ চলাকালে বুড়িচং উপজেলার নিমসার কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ইসমাইল ও সহযোগী সাকিবের নেতৃত্বে ৭টি মাইক্রোবাসযোগে প্রায় ৫০-৬০ জনের একটি সঙ্ঘবদ্ধ দল দেশীয় অস্ত্রসহ বরের বাড়ি থেকে নববধূকে তুলে নিতে আসে। এ সময় বাড়ির লোকজন ও মহিলারা বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। বাড়িঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুরের শব্দ ও নারী-শিশুদের চিৎকারে মুসল্লিরা তাৎক্ষণিক গ্রামের বিভিন্ন মসজিদের মাইকে সন্ত্রাসী হামলার খবর ছড়িয়ে দেয়।

এতে পাশাপাশি কয়েক গ্রামের লোকজন সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসীদের ঘেরাও করে ফেলে মারধর শুরু করে। এ সময় অন্তত ২৫ জন সন্ত্রাসী এবং ৬ জন গ্রামবাসী আহত হয়। স্থানীয়রা ১২ সন্ত্রাসীকে আটক করে পুলিশকে খবর দেন। সংবাদ পেয়ে বিকাল ৫টায় দেবীদ্বার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহরাব হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৭ জনকে আটক করে। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে তাদের থানায় নিয়ে যায়। গ্রামবাসীদের হাতে আটক অপর ৫ জন কৌশলে পালিয়ে যায়।

আটককৃতরা হলো কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার আননদসার গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে আলী হোসেন (২১), বুড়িচং উপজেলার কোরপাই গ্রামের মরণ পালের ছেলে সজিব পাল (১৯), চান্দিনা উপজেলার এদবারপুর গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে বাছির আহমেদ (২২), চান্দিনা উপজেলার মহারং গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে নাহিদুল ইসলাম (২২), বুড়িচং উপজেলার নামতলা গ্রামের সুজাত আলীর ছেলে মোহাম্মদ জাফর (২০), চান্দিনা উপজেলার জাফরাবাদ গ্রামের আব্দুল আউয়ালের ছেলে মেহেদী হাসান (২১) ও দেবীদ্বার উপজেলার সূরপুর গ্রামের মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে মো. আলম (২২)।

সাহারপাড় গ্রামের বরের চাচাতো ভাই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর ছিদ্দিকুর রহমান মাঝি (২৮) দেবীদ্বার উপজেলার সাহারপাড় গ্রামের মো. ইউনুছ মাঝির ছেলে এবং বাড়ির নববধূ ফাতেমা আক্তার (১৮) একই উপজেলার সূর্য্যপুর গ্রামের মো. জাকির হোসেনের মেয়ে। গত ১২ জানুয়ারি ছেলেপক্ষ কনেপক্ষের বাড়িতে গিয়ে পারিবারিক নিয়মে আনুষ্ঠানিকভাবে কনেকে আংটি পড়িয়ে আসেন।

চলতি মাসের ১ ফেব্রুয়ারি তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর কনেকে তার শ্বশুরবাড়ি নিয়ে আসার পর ইসমাইলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী কনেকে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে।

তবে বাড়ির লোকদের প্রতিরোধে তখন তারা পালিয়ে যায়। ওই ঘটনায় বরের বাবা দেবীদ্বার থানায় মামলা করতে আসলে পুলিশ মামলা বা সরাসরি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করে রাখেন। শুক্রবার বৌভাত অনুষ্ঠানে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ইসমাইলের নেতৃত্বে ওরাই আবারও হামলা চালায়।

নববধূ ফাতেমার বাবা জানান, নিমসার কলেজে লেখাপড়াকালীন প্রায়শই মেয়েকে কুপ্রস্তাব দেয়াসহ নানাভাবে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে পথে উত্যক্ত করত ইসমাইল। এ বিষয়ে কয়েকবার অভিযোগও করেছিল ফাতেমা। সন্ত্রাসী ও বখাটে হওয়ায় বাড়াবাড়িতে না গিয়ে মেয়ের সম্মতিতে বিয়ে দিয়ে দেন তিনি।

বৌভাত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী মাস্টার জানান, আমরা জুমার নামাজ আদায় করে এসে দেখি বাড়ির অধিকাংশ ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর, ডেকোরেশন ও খাবার-দাবার মাটিতে পড়ে আছে এবং বাড়ির মহিলারা জানান- তাদের ঘরের টাকা পয়সাসহ অতিথি ও বাড়ির মহিলাদের গহনাগুলোও লুটে নেয় সন্ত্রাসীরা। কয়েকজন সাহসী মহিলা মরিচের গুঁড়া সন্ত্রাসীদের চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিয়ে আটক করতে সক্ষম হন। যতদূর জেনেছি কনেকে তুলে নিতে আসা ইসমাইল আমাদেরই ছাত্র সংগঠনের নেতা। তবে অপরাধী যেই হোক তাদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচারের পক্ষে আমি।

স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দেবীদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ারের জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা জানায়- আমাদের বড় ভাই নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ শাখার ছাত্রলীগ সভাপতি ইসমাইল ও অপর ছাত্রলীগ নেতা সাকিব নূরীতলা এলাকায় সাংগঠনিক মিটিং আছে বলে আমাদের ৭টি মাইক্রোবাস যোগে নিয়ে আসেন। পরে ওখানে গিয়ে জানতে পারি এ ঘটনা। গ্রামবাসীরা আমাদের ঘেরাও করে ফেললে ইসমাইল ও সাকিব ভাই পালিয়ে যায়। এ সময় ইসমাইল নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ শাখার ছাত্রলীগ সভাপতি কিনা তার পরিচয় নিশ্চিত হতে ওই কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মো. আলমগীর হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয় পুলিশ।

আটককৃতরা এ সময় আরও জানায়, কনে ফাতেমা আক্তার (১৮) নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় প্রেমের সম্পর্ক ছিল ইসমাইলের সঙ্গে।

এদিকে নিমসার কলেজ ও পাইকারি কাঁচাবাজার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন স্থানীয় আরতদার অভিযোগ করে বলেন, মাইক্রোবাস ভাড়া করতে শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ভাই আসবে তাই বড় প্রোগ্রামের কথা বলে আড়ত থেকে চাঁদা তোলে ইসমাইলসহ আরও কয়েকজন। এছাড়াও গত কয়েক মাস আগে কলেজের প্রিন্সিপালকে কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেয়ায় প্রকাশ্যে মারধর করে ইসমাইল ও বহিরাগতরা। এ বিষয়ে একটি মামলাও হয় ইসমাইলের বিরুদ্ধে। এছাড়াও কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ইসমাইলের বিরুদ্ধে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে সাধারণ ছাত্রদের।

এ বিষয়ে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আবু তৈয়ব অপি বলেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বুড়িচং উপজেলার নিমসার জুনাব আলী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এ সংগঠনে বিতর্কিতদের ও অপরাধীদের কোনো স্থান হবে না। মেধাবী ছাত্রলীগ গড়তে প্রকৃত ছাত্রদের কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে গঠন করা হবে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি।

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com