প্রচ্ছদ

মাস্টার মতিউর রহমান: শিক্ষা বিস্তারে এক আলোকবর্তিকার নাম

প্রকাশিত হয়েছে : ৬:৫৮:০৬,অপরাহ্ন ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

সিলেটেরকন্ঠডটকম

জুনায়েদুর রহমান :

ছবির মানুষটি আমার আব্বার মতি ভাইসাব। আমরা ডাকতাম মতি চাচাজী। বৃহত্তর জৈন্তা, সিলেট শহরের অলিগলি লাখো মানুষের কাছে প্রিয় মতিউর রহমান স্যার।

বর্তমান কানাইঘাট উপজেলার অন্তর্গত ৫নং বড়চতুল ইউপির দলকিরাই গ্রামে ১৯৪৭ সালে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বৃহত্তর জৈন্তার এক মহান শিক্ষাগুরু মাস্টার হাবিবুর রহমান (ধলাই মাস্টার)। হাবিবুর রহমানের চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে মতিউর রহমান চতুর্থ। শিক্ষক পিতার পথ অনুসরণ করে পেশা হিসাবে মতিউর রহমানও বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতাকে।

তার আগে তিনি ১৯৬৬ সালে সেট্রোল জৈন্তা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৬৮ সালে এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৭০ সালে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।

বৃহত্তর জৈন্তায় মাধ্যমিক শিক্ষার আলোকবর্তিকা হয়ে যে গুটি ক’জন শিক্ষাগুরু এসেছিলেন তাঁরই একজন মাস্টার মতিউর রহমান। দেশ স্বাধীনের পর কানাইঘাটের দূর্গাপুর হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসাবে তাঁর শিক্ষকতার শুরু। সে কালে বিএ পাসদের উচ্চ পর্যায় চাকুরীর খুব চাহিদা ছিল। কিন্তু স্বাধীনচেতা শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা থাকা মানুষটি টাকা পয়সার দিকে না তাকিয়ে বেসরকারী মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তৎকালীন সময়ে বিএ পাস শিক্ষকের অভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল জুনিয়র শিক্ষক দিয়ে চলতো। মাস্টার মতিউর রহমান সেই অভাব পূরণ করেন, তিনি একমাত্র দূর্গাপুর হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক ছিলেন। বাকী কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, গোলাপগঞ্জের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সর্বশেষ মীরাবাজার মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এই মহান শিক্ষাগুরু অল্প বেতনে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। পরিবার নিয়ে সিলেট শহরে বাসা ভাড়া দিয়ে অল্প বেতনে থাকা কতটা কষ্টের সেটা যে কারো উপলব্ধি করার কথা। মাস্টার মতিউর রহমান সেই কষ্ট সহ্য করে তাঁর প্রত্যেকটি সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করেছেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি পাঁচ ছেলে এবং এক কন্যা সন্তানের জনক, খুব ছোটবেলা তাঁর আরো দুই কন্যা পানিতে ডুবে মারা যায়। তিনি নিজে যেমন ছিলেন পাকিস্তান আমলের উচ্চ শিক্ষিত, তেমনি তাঁর সন্তানরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। তাঁর পাঁচ ছেলের মধ্যে চার জনই শাবিপ্রবির কীর্তি শিক্ষার্থী ছিলেন, যারা আজ দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কানাইঘাটের এক অজো পাড়া গাঁ থেকে একই পরিবারের চার ভাই শাবিপ্রবিতে পড়াশোনা করেছেন এটা আজো দিবাস্বপ্ন। কিন্তু মাস্টার মতিউর রহমান সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন।

তার সন্তানদের মধ্যে ইকবাল আহমদ ট্রাস্ট ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ছিলেন, বর্তমানে ইউনাইটেড ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং মুরাদ শাকিল একই ব্যাংকের নতুন অফিসার হিসাবে জয়েন করেছেন। এছাড়া বাকী তিন ছেলের মধ্যে দেলোয়ার হোসাইন (কানাডা প্রবাসী), মোহাম্মদ বাবরুল হোসাইন (আমেরিকা প্রবাসী), বেলাল আহমদ (কাতার প্রবাসী)। এবং একমাত্র কন্যা মাসুদা বেগম একজন স্কুল শিক্ষিকা। তার পুত্র বধুদের মধ্যে একজন বিসিএস ক্যাডার।

তার হাত ধরে বৃহত্তর সিলেটে বাংলাদেশ বেসরকারী মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি গড়ে উঠে। যার সুফল আজ ভোগ করছেন হাজারো মাধ্যমিক শিক্ষক।

মহান এই মানুষটি পেশা জীবনে করেছেন অনেক কষ্ট, অবসর জীবনে এসেও কাটিয়েছেন অনেকটা একাকীত্ব জীবন। দুই ছেলে আমেরিকা ও কানাডা প্রবাসী হওয়ায় অবসর জীবনে এসে তিনি অনেকটা সময় কাটিয়েছেন প্রবাসে, পালন করেছেন পবিত্র হজ্বও। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাস করতেন নগরীর মেজরটিলার শ্যামলী আবাসিক এলাকায়। তিনি গত ০৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে বারোটায় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নানিল্লা.. রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭২ বছর।

চাচাজীর সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল কয়েক মাস আগে। তাঁর বাসায় যাওয়ার পর সেদিন তিনি অনেক উপদেশ মূলক কথা বলেছিলেন, আমার সাথে গল্প করতেন প্রাণখোলে, সবচেয়ে বেশী বলতেন লেখাপড়ার কথা। আমাকে ভাতিজা হিসাবে তিনি অত্যান্ত ভালোবাসতেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তাঁর তিন সন্তানের মতো আমিও মৃত্যুর পর তাঁর মুখটি দেখার সৌভাগ্য হয়নি, পড়তে পারিনি জানাজা। বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগেও তিনি চলাফেরার মধ্যেই ছিলেন, হঠাৎ করেই তিনি যাত্রা করলেন অসীমের পথে।

মাস্টার মতিউর রহমান সারা জীবন শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছেন বিনিময়ে তিনি কিছুই পাননি। অর্থ সম্পদ বলতে তাঁর তেমন কিছুই ছিল না। তিনি খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। একজনকে আমি বলতে শুনেছি, আর্থিক অনটনে থাকা অবস্থায় একবার অর্থের অহংকার করা এক ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি বলেছেন- আমি যেখানে পা দিতে পারবো, সেখানে ওই লোকটি মাথা দিতে পারবে না। সত্যি আমার চাচাজী ছিলেন সমাজের এমনই এক উঁচু মানের মানুষ। এক বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সমাজের উচ্চ পর্যায়ের মানুষের সাথে ছিল তাঁর সখ্যতা।

যে মানুষটি সারা জীবন শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তাঁর কবরে জান্নাতের আলো ছড়াবেন। আল্লাহ আমার চাচাজীকে জান্নাত দান করুন, আমীন।

লেখক: ভাতিজা, মাস্টার মতিউর রহমান।

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com