রবিবার, ৩১ ডিসে ২০১৭ ১১:১২ ঘণ্টা

ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত

Share Button

ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত

ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনাধীন থাকাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া ‘গুম’ ও ‘অপহরণের’ কথা তেমন শোনা যায়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও চরমপন্থীদের হাতে গুম ও অপহরণ হওয়ার ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা গেছে। এক দশক ধরে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সশস্ত্র সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা জোরপূর্বক বিভিন্ন ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের আর হদিস মিলছে না। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জিডি করা হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই থানার সহযোগিতায় উদ্ধারের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপহরণের পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও তাদের হদিস পাওয়া যায়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপহরণের পর দূরবর্তী কোনো স্থানে আঘাতের চিহ্ন সংবলিত মৃতদেহের সন্ধান মিলেছে।

অপহৃত হওয়া কিছু ব্যক্তির সম্প্রতি ফিরে আসার ঘটনায় দেশবাসীর মধ্যে স্বস্তির ভাব ফিরে এসেছে। গুম হওয়ার পর ফিরে আসা কোনো ব্যক্তি তাদের কারা অপহরণ করেছিল, কেন করেছিল এবং কোন স্থানে রেখেছিল- এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি বা দিতে পারেননি। এসব ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও গুম বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী থানায় বা আদালতে প্রতিকার চাওয়ার বিষয়ে উদ্যোগী হওয়ার ব্যাপারে অনীহা লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- গুম থেকে যারা ফিরে এসেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগী হয়ে তাদের বিষয়ে কোনোরূপ তদন্ত করা হবে না; তবে তারা চাইলে থানায় প্রতিকার প্রার্থনার পর বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

আমাদের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য বিষয়ে যা বলা হয়েছে তা হল- সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে বলা হয়েছে- সব সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।

সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যে কোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে এরূপ অন্য কোনো কর্ম।

প্রজাতন্ত্রের কর্মের উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে প্রতীয়মান হয়- রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যারা বেতন ও ভাতাদিসহ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন, তারা সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি। সেই নিরিখে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী পদমর্যাদায় আসীন ব্যক্তি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং অসামরিক ও সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ব্যক্তিসমষ্টি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি।

আমাদের সংবিধানে যেসব মৌলিক অধিকারের বিষয় উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হল- জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ। এ অনুচ্ছেদটিতে ব্যক্ত হয়েছে- আইন অনুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। এ অনুচ্ছেদটি অবলোকনে প্রতীয়মান হয়- শুধু দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য কাজ সংঘটন করেছে এমন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে। জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপ্তি কীরূপ হবে, তা নির্ভর করে অপরাধের মাত্রা ভেদে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অপরাধটি ‘নরহত্যা’ হয়ে থাকলে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বঞ্চনার মাত্রা হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; অপরদিকে অপরাধটি ‘চুরি’ হয়ে থাকলে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বঞ্চনার মাত্রা হবে স্বল্প মেয়াদের কারাবাস।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে গ্রেফতার করা হলে তাকে যথাসম্ভব শিগগির গ্রেফতারের কারণ জানাতে হবে এবং তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরূপ গ্রেফতার ব্যক্তিকে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উপস্থাপন অত্যাবশ্যক।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচয়বিহীন কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত নয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন অনেক ব্যক্তির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়ে থাকে- মামলায় অভিযুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি গ্রেফতার এড়ানোর জন্য নিজেদের লুকিয়ে রেখে সরকারকে বিব্রত করার জন্য গুমের কাহিনীর অবতারণা করেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিদের এ দাবি সঠিক হয়ে থাকলে অবশ্যই প্রতিটি গুমের ঘটনার তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তদন্তের মাধ্যমে দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন, যাতে সরকারকে বিব্রত করার ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এমন অনেক ব্যক্তি গুমের শিকার হয়ে অবশেষে স্বজনদের কাছে ফিরে এলেও তারা নিরুদ্দেশকালীন বিষয়ে মুখ খুলতে অপারগ। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যারা কোনো ধরনের অপরাধ ও মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।

সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের যেমন কর্তব্য, তেমনি প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের পক্ষে এ দায়িত্ব সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা পালন করে থাকেন। যে কোনো ফৌজদারি অপরাধ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ হিসেবে গণ্য। একজন ব্যক্তি অপরাধ সংঘটন করলে তাকে বিচারের আওতায় এনে তার জন্য প্রয়োজনীয় শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশের কোনো আইন অপরাধী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার প্রজাতন্ত্র বা সরকারের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তিকে দেয়নি।

গুমের শিকার হওয়া অনেক ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে গুম হওয়া-পরবর্তী মুক্তিপণ হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা দাবির ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এরূপ ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষত র‌্যাব ও থানা পুলিশকে জানানোর পর কোনো কোনো সময় প্রতিকার পাওয়া গেছে এবং ভুক্তভোগীকে উদ্ধারসহ অপহরণকারীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। এরূপ প্রতিটি ঘটনার জন্য র‌্যাব ও থানা পুলিশ প্রশংসিত হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমানে র‌্যাব ও থানা পুলিশের দক্ষতা যে মাত্রায় উন্নীত হয়েছে, তার সঠিক ব্যবহার হলে দুষ্কৃতকারী কর্তৃক অপহরণ বা গুমের ঘটনা বন্ধ হবে।

গুম ও অপহরণের এমন অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যেসব ঘটনায় গুম ও অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের অদ্যাবধি সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরূপ কিছু কিছু গুম ও অপহরণের জন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠা যে কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণের জন্য গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এ দেশের মানুষ ব্রিটিশ শাসক ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে লক্ষ্যে উপনীত হতে পেরেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কখনও কোনো ব্যক্তিকে অপহরণ অথবা গুমের অভিযোগ ওঠেনি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পেছনে আমাদের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল তা হল, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানি শাসনামলে উপরোক্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে অর্জিত না হওয়ার কারণে এ দেশের মানুষকে পুনরায় স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হতে হয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক অপহৃত হওয়ার পর হদিসবিহীন থাকবে, তা কখনও কাম্য নয়।

দুষ্কৃতকারীরা কাউকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা শত্রুতাবশত এবং অবৈধ পন্থায় অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে অপহরণ বা গুম করে থাকতে পারে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হয়ে সঠিকভাবে এসব ঘটনার তদন্তকাজ পরিচালনা করলে এরূপ ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা আইনের আওতায় শাস্তির সম্মুখীন হবে। ফলে এ ধরনের ঘটনা রোধ হবে বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ।