মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০১৭ ০১:০৩ ঘণ্টা

জঙ্গিবাদ ইসলামের পথ নয়

Share Button

জঙ্গিবাদ ইসলামের পথ নয়

ন্যায় ও সাম্যের ধর্ম। মুসলিম জাতিকে মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। তাকে সুঠাম ও সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করা হয়েছে।

আর সৃষ্টিগতভাবে দান করা হয়েছে বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা ও উপলব্ধির শক্তি, যাতে সে বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সঠিক ও যথার্থ কাজটি করতে পারে। অন্যায়, অবিচার ও অসত্য বর্জন করতে পারে। যা কিছু সৎ, সত্য ও সুন্দর, ইসলাম তা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। তাই ইসলামে জঙ্গিবাদের মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই।

বিশ্বাস জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না

যুগে যুগে মানুষ ধর্মের নামে, ধর্মকে কেন্দ্র করে, আদর্শের লড়াইয়ে ভিন্ন ধর্ম, আদর্শ ও চিন্তার মানুষের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। ইতিহাসে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ একটি স্মরণীয় পরিভাষা।

কেবল ধার্মিকরাই নয়, বহু ধর্মহীন নাস্তিকও এ ব্যাপারে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ধর্ম নিধনের ইতিহাস ভোলার মতো নয়। কেবল ইসলামই বহু ধর্মের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করেছে।

মদিনা সনদ তার জীবন্ত সাক্ষী। ইসলাম কারোর ওপর নিজ ধর্ম, দর্শন চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। আল্লাহ বলেন, ‘দ্বিন গ্র্রহণে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৬)

হজরত নুহ (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এসেছে : ‘নুহ বলল, হে আমার জাতি! বলো তো, আমি যদি আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে অনুগ্রহ দান করেন, আর তা যদি তোমাদের চোখে না পড়ে, তাহলে আমি কি তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তা চাপিয়ে দিতে পারি?’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ২৮)

হজরত নুহ (আ.) অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁর জাতিকে বলেছেন, আমি নবুয়তের যে দাবি নিয়ে এসেছি, তার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। আমাকে অলৌকিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমি যা

বলছি, তা আমার কথা নয়। আমি কেবল ওহির অনুসরণ করি।

মহান আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তিনি নবুয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করেছেন। তবে আমি কোনো বিশ্বাস তোমাদের ওপর চাপিয়ে দেব না। ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া যায় না। চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা আল্লাহ মানুষকে বিচার-বুদ্ধি ও বিবেচনার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ পথ ও মত ঠিক করে নেবে।

নবী বা নবীদের প্রতিনিধিরা কাউকে ঈমান আনতে বাধ্য করেন না। নবীদের দায়িত্ব কেবল আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কাউকে ঈমান আনতে বাধ্য করা নবীদের দায়িত্ব নয়। মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি উপদেশ দাও। তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও। ’ (সুরা : গাশিয়া, আয়াত : ২১-২২)

জঙ্গিবাদ নবী-রাসুলদের আদর্শের পরিপন্থী কাজ

আল্লাহ তাআলা পথহারা মানুষদের সুপথে আনার জন্য এবং পৃথিবী থেকে অন্যায়-অনাচার, খুনখারাবি বিদূরিত করার জন্য যুগে যুগে নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন। নবীরা ছিলেন মাসুম ও নিষ্পাপ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফের ময়দানে কাফেরদের হাতে মার খেয়েও বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, তাদের হেদায়েত দান করুন, তারা নবী হিসেবে আমাকে চেনে না। ’

আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি। ’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)

সব নবী-রাসুলই নিজ উম্মতের হিতাকাঙ্ক্ষী ও আশ্রয়স্থল ছিলেন। মহানবী (সা.) মক্কায় ১৫ বছর বয়সে হিলফুল ফুজুল গঠন করেছেন। মদিনায় গিয়ে মদিনা সনদের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই নবী-রাসুলদের খাঁটি অনুসারীরা জঙ্গিবাদে জড়াতে পারে না। জঙ্গিবাদ ইসলামের পথ নয়। আর জঙ্গিবাদের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয়।

সন্ত্রাস দমনে কোরআনের নীতি

ইসলাম কখনোই হত্যা, নৈরাজ্য সৃষ্টি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না। পৃথিবীতে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হইয়ো না।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না। ’(সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ফিতনা (দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর। ’ (সুরা : বাকারা : ১৯১) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করাকে ইসলাম বিশ্বমানবতার মৃত্যুতুল্য গণ্য করেছে। মুসলমানদের পারস্পরিক রক্তপাতের বিরুদ্ধে হাদিস শরিফে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া গোনাহর কাজ আর তাকে হত্যা করা কুফরি। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৪৪)

কেউ অন্যায়ভাবে হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হলে ইসলাম তার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা কিসাস আইনের প্রবর্তন করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেওয়া হলো। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭৮)

ইসলাম শান্তি প্রতিষ্ঠায় শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দিলেও অন্যায়ভাবে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে, সন্দেহবশত কাউকে হয়রানি ও হত্যা সমর্থন করে না। এ ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮ )

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোর, ক্ষমতার দাপট ও রক্তের বন্ধনকে উপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ, যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা মাতা-পিতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীন। আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)