বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসে ২০১৬ ০১:১২ ঘণ্টা

রাগীব আলী: কালের নিক্তিতে তাঁর মানবিক হৃদয়

Share Button

রাগীব আলী: কালের নিক্তিতে তাঁর মানবিক হৃদয়

ফকির ইলিয়াস: না- রাগীব আলী এখনও জামিন পান নাই। আমরা একটিই বিষয়ই দাবী করছি, তাঁকে জামিন দেয়া হোক। তারপর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা Raকরা হোক। যে বিষয়টি আমরা খুব স্পষ্টভাবে দেখছি- একটি মহল তাঁর এই জামিনের বিরোধিতা করছেন। যারা সরকারের নিয়োজিত আইনজীবি,তাঁদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নাই।তাঁরা সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন।কিন্তু যারা সামাজিকভাবে
বিবেচক- তারা ?
কেউ কেউ চাইছেন, পারলে রাগীব আলীকে কালই ফাঁসি দিয়ে দেয়া হোক। এর
কারণ কি ? আবারও বলি- দেওয়ানি এরকম মামলা বাংলাদেশে আগেও হয়েছে।
চলেছে। বিচার হয়েছে। রাষ্ট্রের আইনের প্রতি আমরা খুবই শ্রদ্ধাশীল। সেই আলোকেই
আমি এই নিবন্ধে কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই।
অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ১৯৭১ সালে রাগীব আলী সাহেবের ভুমিকা কি ছিল।
বলে নেয়া দরকার, ১৯৯২ সালে আমি ছয়মাসেরও বেশি সময় ইংল্যাণ্ডে অবস্থান করি। সেই সময়ে আমার একটা বড় প্রজেক্ট ছিল-‘ অভিবাসে বাঙালী প্রজন্ম ও তাদের ভবিষ্যত।’ যা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মিডিয়ায় ছাপা হয়। ওই সময়ে আমি
মহান মুক্তিসংগ্রামে বিলাত প্রবাসীদের ভূমিকা বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করি।
সেই সময়ে কামাল বাজার এলাকার (যা আমার নিজেরও এলাকা) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ
ব্যক্তিত্বের সাথে আমার কথা হয়। আগে ও পরে আমি যাঁদের সাথে কথা বলি তাদের
মধ্যে ছিলেন আলহাজ্ব আব্দুল আহাদ চৌধুরী, আলহাজ্ব এম এ হাসিম, আলহাজ্ব লাল
d7মিয়া, আলহাজ্ব আব্দুর রহমান, জনাব মনোয়ার আলী, আলহাজ্ব তাহির আলী প্রমুখ। তারাও একবাক্যে একাত্তরে একজন প্রবাসী রাগীব আলীর ভূমিকা বিষয়ে আমাকে নিশ্চিত করেন। তাঁদের অনেকে এখনও বেঁচে আছেন। কেউ বেঁচে নেই।
রাগীব আলী ১৯৭১ সালে প্রবাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক। যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে তখন লন্ডনে বসবাসরত বাঙালিরা বিভিন্ন শহরে সভা সমাবেশ করতে থাকেন। রাগীব আলী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা বিষয়ে জনমত গঠনের জন্য লিফলেট মুদ্রণ করান এবং তা বিতরণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও মালিকানাধীন তাজমহল রেস্টুরেন্টে যারা খাবার গ্রহণ করতে আসতেন তাদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করতেন। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশীদের সহানুভূতি ও সমর্থন অর্জন করা। রেস্টুরেন্টের সামনেও প্ল্যাকার্ড স্থাপন করেন। এতে লেখা ছিল “Stop Genocide in Bangladesh. Liberate Bangladesh”। তখন ২৪ কেমব্রিজ গার্ডেনে বাংলাদেশ সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রেও দানবীর রাগীব আলী প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। নতুন একটা ইলেকট্রনিক টাইপরাইটার কিনে তিনি সেটা নিজের কাঁধে বহন করে বাংলাদেশ সেন্টারে পৌঁছে দেন। এই মেশিনটির দাম ছিল ২৬৫ পাউন্ড। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ সেন্টারের অফিসে একটি টেবিল, চারটি চেয়ার এবং সভাকক্ষের জন্য একটি কার্পেট কিনে দেন। মুক্তিযুদ্ধ তহবিলেও রাগীব আলী প্রভূত অর্থ দান করেন। এছাড়া তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ও পথে পথে ঘুরে বাংলাদেশ তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
তাঁর এই ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ আমরা জানি,
হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালী এভাবেই একাত্তরে বিলাত থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
রেখেছিলেন।

॥ দুই ॥

প্রিয় পাঠক, আপনাদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। জামায়াতের নায়েবে আমীর, একাত্তরের গণহত্যায় সাজাপ্রাপ্ত মওলানা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর রায় প্রদানের দিন মাননীয় বিচারক একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,”আমি মওলানা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর সাজা ঘোষণা করছি না। আমি সাজা ঘোষণা করছি,একাত্তরের মানবতা বিরোধী কুখ্যাত রাজাকার নেতা দেলওয়ার শিকদার ওরফে দেইল্যা রাজাকরের।”
হ্যাঁ- তিনি কুখ্যাত রাজাকার হিসেবে বাংলাদেশের আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন।
কে এই সাঈদী ? ৮০ এর দশকে কি ছিল তার ভূমিকা ? কি ভূমিকা তার ছিল
১৯৭২- থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সময়ে ?বলে রাখি, সেই সময়ে সাঈদী বাংলাদেশে
শুধুমাত্র ওয়াজ করেই পরিচতি পেয়েছিলেন। এর বাইরে তার কনো পরিচয় প্রকাশিত
ছিল না। একাত্তরে তার ভূমিকা রাষ্ট্র, জনগণের কাছে ছিল অনেকটাই অজানা। যা
প্রকাশিত হতে অনেক সময় লেগেছে।
একটা বিষয় বার বার ঘুরে ফিরে আসছে, সাঈদীকে সিলেটে নিয়ে গিয়ে রাগীব
আলী ওয়াজ মাহফিল করেছিলেন। বিষয়টি আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সিলেটে মওলানা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীকে প্রথম যারা নিয়ে যান তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরী।তিনি সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠেই প্রথম
সাঈদী’র ওয়াজের সুযোগ করে দেন। এর পর থেকে মওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরীই
ছিলেন সিলেটে মওলানা সাঈদীর অন্যতম হোস্ট। তখনও সিলেটবাসীর কাছে অজানা
ছিল সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার এই শিক্ষক মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরীর রাজনৈতিক মতাদর্শ।
সিলেটে সাঈদী বিরোধী আন্দোলন চরমে পৌঁছে ১৯৮৮ সালে। এর আগেই মওলানা সাঈদী’র সিলেটের হোস্ট কমিটির মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সিলেটের কামাল বাজারে মওলানা সাঈদী’কে নিয়ে রাগীব আলী ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করেন ১৯৮৭ সালে। কামাল বাজার সংলগ্ন মাঠে এই তাফসির মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এখানে আমি যে প্রশ্ন গুলো করতে চাই, তা হলো –
১। ১৯৮৭ সালে এরশাদের স্বৈরশাসন চলছিল। এরশাদ তখন ক্ষমতায়। মওলানা
সাঈদী কি তখন জামায়াতের মজলিসে সূরার সদস্য পদে জনসমক্ষে ছিলেন ? তার
কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল ? না- ছিল না। তিনি পরিচিত ছিলেন একজন
তাফসিরকারী, ওয়ায়েজ হিসেবে। রাগীব আলী একজন ওয়ায়েজকে(যিনি ওয়াজ করেন) সিলেটে আথিয়েতা দিয়েছিলেন। যে সাঈদীর, সেই সময়ে কোনও রাজনীতি
সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
২। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে, তার ধর্মের প্রচার রাগীব আলী চাইতেই পারেন। এটা তাঁর অপরাধ নয়। তাই কোনও তাফসির মাহফিলের( ১৯৮৭ সালে)
পৃষ্ঠপোষকতা করা কোনও অন্যায় হতে পারে না।
৩। সাঈদী রাজনীতিতে আসেন আরও অনেক পরে। ১৯৯৬ সালে ও ২০০১ সালে তিনি এম পি নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক মুখোশ এই সময়েই খসে পড়ে।
রাগীব আলীর বিরুদ্ধে এই প্রসঙ্গে যারা মিথ্যার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছেন- তাদের জানা দরকার রাগীব আলী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। তিনি বড় বড় অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, আবুল মাল আব্দুল মুহিত, নুরুল ইসলাম নাহিদ,দেওয়ান ফরিদ গাজী, এম সাইফুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, এবাদুর রহমান
চৌধুরী,এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, সৈয়দ মহসীন আলী, সহ সিলেট বিভাগের প্রায় সকল সিনিয়র রাজনীতিকের সাথে রাগীব আলীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল কিংবা আছে।
সাঈদী’র বিচার হয়েছে খুব সম্প্রতি। রায় হয়েছে। এখন একটি চিহ্নিত মহল ১৯৮৭ এর ঘটনাকে ‘চলমান’ হিসেবে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। রাগীব আলী একজন
ইনভেস্টর। তিনি জমি-জিরাতে ইনভেস্ট করেছেন।তা করতে গিয়েই তিনি প্রতারিত
হয়েছেন। কারা তার সাথে প্রতারণা করেছে ? এরা কারা ? কোথায় এখন তারা ?
কারা তাঁকে শল্লা-পরামর্শ দিয়ে ভারতে পাঠিয়েছিল ? কেন পাঠিয়েছিল ?
এসব অনেক কথাই আমাদের জানা দরকার। আমাদের জানা দরকার, কোন প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আজ তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ?
রাগীব আলী এই সমাজের জন্য কি কি করেছেন- তা দেশবাসী সবাই জানেন।
এই দেশে রাগীব আলীর চেয়ে আরও অনেক বেশি সম্পদশালী রয়েছেন। কিন্তু রাগীব
আলীর মতো জনহিতকর কাজে এগিয়ে এসেছেন- তাদের সংখ্যা খুবই বিরল।
আমি আবারো আহ্বান জানাই, মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক-
মজুর-কৃষক-চিকিৎসক সহ সকল পেশাজীবি মানুষেরা এগিয়ে আসুন। আপনারা নিজেদের বুকে হাত দিয়ে কালের নিক্তিতে রাগীব আলীর হৃদয়টি একবার অনুধাবন
করুন। হ্যাঁ- ভুল তিনি করেছেন। তাঁর ভুল হলো তিনি মানুষকে সরল বিশ্বাস করেছেন। আমরা জানি, এরকম প্রবাসীরা জমি-জিরাত ইস্যুতে প্রতিবছরই
বাংলাদেশে প্রতারিত হচ্ছেন। তারা বিচার পাচ্ছেন না। বরং তাদের পালিয়ে বিদেশে
ফিরে আসতে হচ্ছে।
রাগীব আলী বাংলাদেশে তাঁর শিকড় গাড়তে চেয়েছিলেন। তাঁকে জামিন দিয়ে সরকার
একজন সমাজসেবকের প্রতি ন্যূনতম সম্মানটুকু প্রদর্শন করবেন- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: নিউইর্য়ক প্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক,কলামিস্ট এবং কবি