শুক্রবার, ১৩ এপ্রি ২০১৮ ১০:০৪ ঘণ্টা

ভয়ে পালিয়েছে হতভাগ্য আসিফার পরিবার

Share Button

ভয়ে পালিয়েছে হতভাগ্য আসিফার পরিবার

ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে ধর্ষণের পর খুন হওয়া শিশু আসিফার পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।

ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তদের পক্ষে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের বিক্ষোভ, জম্মু-কাশ্মীরের বার অ্যাসোসিয়েশন অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়ানো এবং চার্জশিটের বিরোধিতা করায় ভীত হয়ে তারা পালিয়েছে বলে খবর দিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম এই সময়।

খবরে বলা হয়েছে, আসিফার বাবা মুহাম্মদ ইউসুফ পুজওয়ালা তার স্ত্রী, দুই সন্তান এবং গবাদিপশু নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছেন অজানা কোনও ঠিকানায়। তবে মে মাসে তারা কাশ্মীরে চলে যাবেন বলে জানিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসে আসিফাকে অপহরণ করা হয়। তার এক সপ্তাহ পরে গ্রাম থেকে বেশ কিছুটা দূরে আসিফার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে ঘটনার যে বিবরণ উঠে এসেছে, তা এককথায় বীভৎসতার চূড়ান্ত পর্যায়। এতে বলা হয়েছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী যাযাবর সম্প্রদায়কে হিন্দুপ্রধান এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া, আর তাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করার জন্য ওই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ১৯ বছরের এক তরুণকে গ্রেফতার করে।

তরুণের জবানবন্দির ভিত্তিতে তার চাচা মন্দিরের (যে মন্দিরে আসিফাকে আটকে রেখে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়) পরিচালক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা সানজি রাম এবং পুলিশ কর্মকর্তা দীপক খাজুরিয়াকে গ্রেফতার করে।

এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার চতুর্থ ব্যক্তি স্পেশাল পুলিশ অফিসার সুরিন্দর কুমার। তাকে প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনাস্থলে দেখছিল।

ওই তরুণের বন্ধু প্রবেশ কুমারও শিশুটিকে ধর্ষণ করেছে। তাকে খুঁজছে পুলিশ।

এদিকে তাদের মুক্তির দাবিতে ও গোটা ঘটনা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো সিবিআইকে দিয়ে তদন্ত করাতে জম্মু অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ দেখিয়েছে।

কাশ্মীরের এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিংহ টুইটবার্তায় বলেন, ‘আসিফাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলাম। কিন্তু বিচার ওকে পাইয়ে দিতেই হবে।’

বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রথম আসিফার ঘটনায় মুখ খোলা হল। এর আগে ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে সরব হতে দেখা গিয়েছে বিজেপির সমর্থনপ্রাপ্ত ‘হিন্দু একতা মঞ্চ’কে।

গত মাসে আর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ ধর্ষণে অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘যারা অপরাধ করেনি, তাদের বিচার মেলা উচিত।’

ভি কে সিংহের পরপরই টুইট করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। তিনি লিখেছেন, ‘একজন অপরাধীকে কীভাবে কেউ আড়াল করতে পারে? একটি শিশুর সঙ্গে যে নৃশংস অপরাধ হয়েছে, তার মধ্যেও যদি আমরা রাজনীতি টেনে আনি, তাহলে আমাদের কী অবস্থা ভাবুন!’

জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য পুলিশের অপরাধ শাখা বলছে, আট বছরের ওই কন্যাশিশুকে জম্মুর কাঠুয়া জেলায় তার বাড়ির কাছ থেকে অপহরণ করা হয়েছিল।

যাযাবর গুজ্জর জাতিগোষ্ঠীর শিশুটিকে এ বছরের ১০ জানুয়ারি অপহরণ করা হয়, যখন সে পোষা ঘোড়া আর ভেড়াগুলোকে চড়াতে নিয়ে গিয়েছিল।

পরদিন তার পরিবার হীরানগর থানায় অপহরণের মামলা করে। সাত দিন পর তার মরদেহ পাওয়া যায় কাঠুয়া জেলারই বসানা গ্রামে।

ঘটনাটি নিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষোভ বাড়তে থাকে, একসময়ে বিষয়টি পৌঁছায় রাজ্য বিধানসভায়। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি অপরাধ শাখাকে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার কথা ঘোষণা দেন।

তদন্তের শুরুতেই দেখা যায় যে, ওই কন্যাশিশুর খোঁজ করতে পুলিশ কর্মীরা যখন জঙ্গলে গিয়েছিলেন, তার মধ্যেই এমন দুজন ছিলেন, যারা মৃতদেহটির পোশাক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর আগে একবার জলে ধুয়ে নিয়েছিল।

সন্দেহ বাড়ায় তাদের জেরা শুরু হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে ওই দুই পুলিশ কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তারা দুজনেই ওই হীরানগর থানায় কর্মরত ছিলেন।

তল্লাশি চালিয়ে বসানা গ্রামের একটি মন্দির থেকে কিছু চুল খুঁজে পান তদন্তকারীরা। তাদের সন্দেহ হয় যে ওই চুল অপহৃত কন্যাশিশুটির হতে পারে।

অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ওই মন্দিরের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন সাঞ্জি রাম নামে যে ব্যক্তি, তিনিই নিজের ছেলে আর ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে বসে ওই কন্যাশিশুকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন।

গুজ্জর সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করাই উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তারা ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে এ রকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, বাকারওয়াল বা যাযাবর সম্প্রদায়ের ওই মানুষরা গরু জবাই করে আর মাদকের কারবার করে। এ নিয়ে এর আগে দুই তরফেই পুলিশের কাছে বহু অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ জমা হয়েছে।

চার্জশিটে পুলিশ এটিও উল্লেখ করেছে যে, ধর্ষণের আগে ওই মন্দিরে কিছু পুজো করা হয়। ৬০ বছর বয়সী সাঞ্জি রাম, তার ছেলে বিশাল আর নাবালক ভাইয়ের ছেলে, চার পুলিশ কর্মী এবং আরেক ব্যক্তি গোটা ঘটনায় সরাসরি যুক্ত।

ওই কন্যাশিশুকে অপহরণ করে নিয়ে আসার পর তাকে মাদক খাইয়ে অচেতন করে রাখা হয়েছিল। তার মধ্যেই তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে যে নাবালক রয়েছে, সে তার চাচাতো দাদা সাঞ্জি রামের ছেলে বিশালকে উত্তরপ্রদেশের মীরঠ শহর থেকে ডেকে আনে ফোন করে, যাতে সেও ওই কন্যাশিশুটিকে ধর্ষণ করতে পারে।

চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, টানা ধর্ষণ করার পর যখন অভিযুক্তরা ঠিক করে যে এবার ওই কন্যাশিশুটিকে মেরে ফেলার সময় হয়েছে, তখন একজন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মী অন্যদের বলে, এখনই মেরো না। দাঁড়াও। আমি ওকে শেষবারের মতো একবার ধর্ষণ করে নিই।

তারপর ওই পুলিশ কর্মী নিজে চেষ্টা করে কন্যাশিশুটিকে হত্যা করতে, কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। শেষে নাবালক অভিযুক্ত ওই কন্যাশিশুকে হত্যা করে। তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে মাথা থেঁতলে দেয়া হয় একটা পাথর দিয়ে। ময়নাতদন্তে জানা গেছে, ওই কন্যাশিশুটিকে মাদকের বড়ি খাইয়ে তারপর ধর্ষণ করা হয়েছে।