বুধবার, ০৪ এপ্রি ২০১৮ ১১:০৪ ঘণ্টা

‘বাবু সোনাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা করা হয়’

Share Button

‘বাবু সোনাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা করা হয়’

আইনজীবী বাবু সোনাকে হত্যা করা হয় গত ২৯ মার্চ রাতেই। দুই মাস আগেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

হত্যাকারী ধরা পড়ায় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক অশান্তি, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, পরকীয়া প্রেম ও হত্যাকাণ্ডের বেদনাদায়ক অধ্যায়ের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

বুধবার দুপুরে রংপুর র‌্যাব-১৩ কার্যালয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজির আহমেদ এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘বাবু সোনাকে হত্যার আগে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। যারা বাবু সোনাকে হত্যা করেছে তাদেরকে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের মুখোমুখী করা হবে। বাবুর স্ত্রীসহ যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। তখন আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।’

র‌্যাবের ডিজি সংবাদ সম্মেলনের আগে নিহত বাবু সোনার বাসভবনে যান এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। এ ছাড়া যেখান থেকে বাবু সোনার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে মোল্লাপাড়ায় সেই স্থান পরিদর্শন করেন।

র‌্যাবের সূত্র জানিয়েছে, গত ৩০ মার্চ আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বিষয়টি র‌্যাব অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখে। প্রথমে রংপুর কোতোয়ালি থানায় ৩১ মার্চ একটি জিডি করা হয়। উক্ত জিডির ভিত্তিতে র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীকালে বাবুর ছোট ভাই ১ এপ্রিল একটি মামলা করেন। এর ধারাবাহিকতায় বাবু সোনার স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার দীপাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব সদস্যরা তাদের কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং লাশের অবস্থান সম্পর্কে র‌্যাবকে জানান।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে বাবু সোনার স্ত্রী দীপা জানান, পারিবারিক কলহ, সন্দেহ ও পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়ে তিনি তার স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করেন তার প্রেমিক কামরুল মাস্টার। কামরুল মাস্টার ও স্নিগ্ধা সরকার দীপা উভয়েই তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তারা দুই মাস আগে বাবু সোনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

সূত্র জানায়, ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার বাবু সোনাকে তার শয়ন কক্ষে রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ভাত ও দুধের সাথে ১০টি ঘুমের বড়ি খাওয়ানো হয় । ঘুমের বড়ি খাওয়ানোর পর অচেতন হয়ে গেলে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর রাতে লাশ শয়ন কক্ষেই রেখে দেওয়া হয়। কামরুল মাস্টার পরের দিন ভোর ৫টার দিকে ওই বাসা থেকে বের হয়ে যান। পরে সকাল ৯টার দিকে কামরুল একটি ভ্যান নিয়ে আসেন। লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে বাবু সোনার স্ত্রী তার প্রেমিকের সহায়তায় একটি আলমারি পরির্বতনের নাম করে আলমারিতে লাশ ভরে তাজহাট মোল্লা পাড়ায় নির্মাণাধীন বাড়িতে ঘরের বালু খুড়ে পুঁতে রাখেন।

আলমারি বহন করে ভ্যানে তোলার কাজে নিয়জিত ছিলেন তিনজন। ওই তিনজনকে কামরুলই নিয়ে আসেন। কামরুলের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে র‌্যাব সদস্যরা মোল্লাপাড়ার ওই বাড়ি থেকে বাবু সোনার লাশ উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে লাশ শনাক্ত করার জন্য বাবু সোনার ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিককে ঘটনাস্থলে নেওয়া হলে তিনি তার ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন।

বাবু সোনার লাশ লুকানোর সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আরো দুজনকে আটক করা হয়েছে। এরা হলেন- মোল্লাপাড়া এলাকার মো. রবিউল ইসলামের পুত্র সবুজ ইসলাম (১৭) ও রফিকুল ইসলামের পুত্র রোকনুজ্জামান (১৭)।

জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ ও রোকনুজ্জামান জানায়, তারা গত ২৬ মার্চ কামরুল মাস্টারের নির্দেশে ৩০০ টাকার বিনিময়ে উক্ত নির্মাণাধীন ভবনের কক্ষে বালু খুড়ে রাখে। পরে ৩০ মার্চ শুক্রবার বেলা ১১টায় গর্তে লাশ রেখে বালু দিয়ে ঢেকে দেয়।

বাবু সোনা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজাহারুল ইসলামের মামলার সাক্ষী ছিলেন। জাপানের নাগরিক হোশে কুনিও এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবীও ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও রংপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সহসাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের রংপুর বিভাগের ট্রাস্ট্রি, পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর জেলার সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে নগরীর মাহিগঞ্জ মোল্লাপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ির মাটির নিচ থেকে বাবু সোনার লাশ উদ্ধার করা হয়।