প্রচ্ছদ

দুই সাংবাদিককে মারধর: অভিযোগপত্রে নেই লিয়াকতের নাম

প্রকাশিত হয়েছে : ১১:৩৫:১৮,অপরাহ্ন ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | সংবাদটি ২ বার পঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

সিলেটের আদালত প্রাঙ্গণে দুই সাংবাদিককে নির্যাতনের ঘটনায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশের উপ পরিদর্শক হাদিউল ইসলাম।

বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সাইফুজ্জামান হিরোর আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন তিনি। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্রের শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত। চার্জশীট নং ৫০/১৮।

আওয়ামী লীগ নেতা ও হত্যা মামলার আসামি লিয়াকত আলীসহ তার তিন সহযোগীকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্রটি দাখিল হয়। বাদির বক্তব্য না নিয়ে যথাযথ তদন্ত ছাড়াই দফারফার মাধ্যমে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় বলে অভিযোগ বাদীপক্ষের।

এদিকে অভিযোগপত্র দাখিলের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন নির্যাতিত সাংবাদিক ও মামলার বাদি যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন নিরানন্দ পাল। তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর সাথে কোন কথা না বলেই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়ে দিয়েছেন। কোন রকম তদন্ত ছাড়াই এই ‘ফরমায়েশি চার্জশীট’ তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগপত্রটি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত বিধায় আমি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য আদালতের কাছে প্রার্থনা জানাবো।

জোটবদ্ধ আন্দোলনে থাকা ৫ সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি তারা ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান।

মামলার বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মঈনুল হক বুলবুল বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা যে মনগড়া অভিযোগপত্রটি দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে আদালতে আমরা নারাজি দেব। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আদালত সময় দিয়েছেন। পাশাপাশি বাদীকে না জানিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেছেন। এটা গুরুতর অপরাধ। এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাদী আদালতে আবেদন করেছেন। এ ব্যাপারে আদালত পরবর্তীতে আদেশ দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, এই মামলার আসামি লিয়াকত ও শামীম আহমদকে জামিন দিয়েছেন আদালত।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, অবৈধভাবে পাথর লুটে কোটি কোটি টাকার কালো টাকা আয়ের পর পাথর খেকোরা বেপরোয়া। তারা বরাবর ধরাকে সরাজ্ঞান করে চলে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা আদালত প্রাঙ্গণেও হামলার সাহস পেয়েছে। এসব অপকর্মে তাদের কিছুই হবেনা এটা নিশ্চিত হয়েই তারা একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। চার্জশীট থেকে বাদ পড়া, জামিন পাওয়া সবকিছুই তাদের জন্য সম্ভব। শ্রমের টাকায় কিছু করা না গেলেও কালো টাকায় অনেক কিছুই হয়।

এ ব্যাপারে কথা বলতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব ইন্সপেক্টর হাদিউল ইসলামের নাম্বারে বারবার ফোন করলেও মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সিলেট কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গৌছুল হোসেন জানান, সাংবাদিক নির্যাতনের মামলায় ভিডিও ফুটেজ দেখে ১৩ আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এজাহারে উল্লেখিত ৪ জন অভিযুক্তকে বাদ দেয়া হয়েছে। ভিডিও ফুটেছে তাদের শনাক্ত করতে না পারায় তাদেরকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়া ৪ অভিযুক্ত হচ্ছেন- সিলেটের জৈন্তাপুরের মল্লিফৌদ গ্রামের ওয়াজিদ আলী টেনাইয়ের পুত্র লিয়াকত আলী, নয়াখেল গ্রামের মতিউর রহমানের পুত্র ফয়েজ আহমদ বাবর, আদর্শ গ্রামের জালাল মিয়ার পুত্র শামীম আহমদ ও খারুবিল গ্রামের আলী আহমদের পুত্র মো. হোসাইন আহমদ।

অভিযোগপত্রে অভিযুক্তরা হচ্ছে, জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত গ্রামের খাতির আলীর পুত্র নজরুল ইসলাম, হরিপুর গ্রামের লাল মিয়ার পুত্র জুয়েল আরমান, চাল্লাইন গ্রামের সাইফ উদ্দিনের পুত্র নুরুদ্দিন মড়া, ঘাটেরছটি গ্রামের লুৎফুর রহমান কালার পুত্র এম জেড জাহাঙ্গীর, শফিকুর রহমানের পুত্র তোফায়েল আহমদ, আলু বাগান গ্রামের মোস্তফা মিয়ার পুত্র সৈয়দ রাজু, বাউরবাগ মল্লিফৌদ গ্রামের মোহাম্মদ আলী মড়ার পুত্র ফারুক আহমদ, হাটিরগাঁও গ্রামের হোসেন মিয়ার পুত্র শাব্বির আহমদ, আদর্শ গ্রামের আইয়ুব আলীর পুত্র মনির মিয়া, লক্ষ্মীপুর পূর্ব গ্রামের মনির মিয়ার পুত্র তাজ উদ্দিন, সরুফৌদ গ্রামের সিদ্দিক আলীর পুত্র হোসেন আহমদ উরফে টাটা হোসেন, সরুখেল পশ্চিম গ্রামের আবুল হোসেনের পুত্র সুলতান আহমেদ ও বাউরবাগ গ্রামের আব্দুল হান্নানের পুত্র নুরুল ইসলাম। জব্দ করা ভিডিও ফুটেজ দেখে এই ১৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে চার্জশীটে উল্লেখ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

সিলেটের পাথর খেকো লিয়াকত আলী ও ফয়েজ আহমদ বাবরের নির্দেশে তাদের ক্যাডার বাহিনী সিলেটের আদালত প্রাঙ্গণে গত ২৫ জানুয়ারি দুই সাংবাদিকের উপর হামলা চালায়। এতে যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন নিরানন্দ পাল ও যুগান্তরের চিত্রগ্রাহক মামুন হাসান আহত হন।

এ ঘটনায় নিরানন্দ পাল বাদী হয়ে লিয়াকত আলী ও ফয়েজ আহমদ বাবরকে প্রধান অভিযুক্ত করে আরও ১৫/১৬ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন পুলিশের উপ পরিদর্শক হাদিউল ইসলাম। নির্ধারিত সময়ে তিনি তদন্ত কাজ শেষ করতে না পেরে আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করলে আদালত ৭ দিনের সময় বেঁধে দেন। আজ (বুধবার) ছিল বর্ধিত সময়ের শেষ দিন।

সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় সিলেটের সাংবাদিকসমাজসহ পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ঘটনার পর সিলেটে কর্মরত সাংবাদিকদের ৫ সংগঠন লাগাতার আন্দোলন শুরু করে। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে পালিত হয় মানববন্ধন, কর্মবিরতি, অবস্থান কর্মসূচি ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি।